
১.
আমার বাবা, আমার অসম্ভব মেধাবী বাবা ড. মো. রফিকুল আলম গত বৃহস্পতিবার, ৫ই মার্চ ২০২৬ সালে ইন্তেকাল করেছেন। ১৬ই ফেব্রুয়ারী ফুসফুসে ইনফেকশনে আইসিইউতে ভর্তি হয়ে ১৭ই ফেব্রুয়ারী তিনি লাইফ সাপোর্টে চলে যান এবং টানা ১৮ দিনের কষ্টকর সময়গুলো পার হয়ে শান্তিময় পরকালে পাড়ি জমান।
আমার বাবা ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস ঢাকা থেকে শিল্পকলার ইতিহাসে ‘ক্রেডিট মার্কস’ সহ ড্রয়িং ও পেইন্টিং-এ স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯৭৪ সালে এম. এ. ইন ফাইন আর্টস, চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ১৯৮৩ সালে ভারতের বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘ফাইন আর্টস’ ও ‘হিস্ট্রি অফ আর্টস’ এ দুটি বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করে, যা বাংলাদেশের চিত্রশিল্পীদের মধ্যে সর্বপ্রথম ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ। ১৯৯০ সালে টোকিও ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ ফাইন আর্টস অ্যান্ড মিউজিকে পোস্ট ডক্টরাল গবেষণা সম্পন্ন করেন। এক্ষেত্রেও বাবা ছিলেন অনবদ্য কারন তার আগে বাংলাদেশী কোন আর্টিস্টের কেউ শিল্পকলায় পোস্ট ডক্টরাল থিসিস করার কৃতিত্ত্ব ছিলো বলে আমাদের জানা নেই।
১৯৭৫ সালে খুলনা শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়ে চারু ও কারুকলার প্রভাষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের শুরু। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত খুলনা আর্ট কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন। ১৯৮৮ সালে চারুকলা ইনস্টিটিউটে যোগদান। এরপর এই বিভাগে প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনিই বাংলাদেশে প্রথম শিল্প সমালোচনার ধারাবাহিক কলাম লেখার সুচনা করেন। সাবেক সাপ্তাহিক “বিচিত্রা” পত্রিকার সম্পাদক প্রয়াত শাহাদত চৌধুরী ও শিল্পী رফিকুন নবীর অনুরোধে ওই পত্রিকায় সমকালীন শিল্পকলার প্রদর্শনী উপলক্ষে ৪০টিরও অধিক শিল্প সমালোচনা প্রকাশিত।
আমার বাবা চারুকলার ছাত্রদের জন্য ১৪টির বেশি শিল্পকলা ও শিল্পের ইতিহাসের বই লিখে গেছেন। তার বইগুলো প্রকাশিত হয়েছে বাংলা একাডেমী, মাওলা ব্রাদার্স, চয়নিকা, বাংলাদেশে শিল্পকলা একাডেমী, পাঠক সমাবেশ, অনন্যা ইত্যাদি প্রকাশনীর মাধ্যমে। তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে: উপমহাদেশের শিল্পকলা, Folk Painting in Bangladesh, বিশ্বসভ্যতা ও শিল্পকলা, কিউবিজম ও অনুষঙ্গ, সুরিয়ালিজম, এক্সপ্রেশনিজম, বিশ্বের মৃৎশিল্প, ইসলামী সভ্যতা ও শিল্পকলা, আধুনিক শিল্পকলা: ইম্প্রেশনিজম ও তারপর এবং পাশ্চাত্য শিল্পের ইতিহাস ইত্যাদি।







বাংলাদেশে শিল্পকলা ও শিল্পকলার ইতিহাসে তার অনন্য অবদান থাকলেও দেশের মানুষের কাছে তিনি অনেকটাই অপরিচিত ছিলেন। এই অপরিচিত থেকে যাওয়ার পেছনে রয়েছে আমাদের দেশের যোগ্য, সৎ ও ধান্দাবাজ নয় এরকম মানুষের মূল্যায়ন না করার একটা সিস্টেমিক কন্ডিশন। যখন তার আশেপাশের সহকর্মী, শিল্পী ও শিক্ষকেরা রাজনৈতিক আনুকুল্য, সাদা-গোলাপী ব্যানারে দলবাজিতে লিপ্ত কিংবা ক্ষমতাবানদের চাটুকারীতার প্রতিযোগিতায় নিজেদের এগিয়ে নিতে ব্যস্ত; তিনি তখন নীরবে নিভৃতে নিজের কাজগুলো করে যাওয়াকেই বেছে নেন।
একাডেমিক যোগ্যতার দিক থেকে এবং এডমিনিস্ট্রেশন চালানোর দক্ষতার দিক থেকে নি:সন্দেহে তিনি ছিলেন স্বাধীনতাউত্তর দেশে সেরাদের মধ্যে সেরা। কিন্তু এই একাডেমিক যোগ্যতার কারনেই তাঁকে তার সহকর্মীদের ঈর্ষার স্বীকার হতে হয়। তাঁকে বিভিন্নভাবে বঞ্চিত করার চেইন রিয়্যাকশনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, কেননা এই দেশে কেউ যোগ্যতায় উপরে উঠে গেলে অযোগ্য ও চালবাজরা ভীষন হীনমন্যতায় ভুগতে শুরু করে এবং নিজেদের স্বার্থের উপরে চরম আঘাত হিসেবে সেটাকে দেখে।
২.
আমার বাবার সাথে আমার সবচেয়ে পুরাতন স্মৃতি হলো আমাদের দাদাবাড়ীর চিলেকোঠাসহ যে ছাদটি ছিলো, সেই ছাদের খোলা শাওযারে বাবার সাথে গোসল করা। আমার বয়স হয়তোবা তখন ৩ বা ৪ কি ৫। খুব অস্পষ্ট স্মৃতিতে যতটুকু মনে আছে বাবার সাথে একসাথে গোসল ছিলো আমার ছোট বেলার অন্যতম আনন্দময় স্মৃতি।
বিষয়টা এতটাই অবচেতনে ঢুকে গেছে যে আমি আমার সন্তানদেরকেও এই একই আনন্দে মেতে উঠি হরহামেশায়।
বাবার প্রিন্সিপ্যাল ও মোরাল বা নীতি নৈতিকতা, তাঁর জীবন থেকে আমার জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা। যে বর্তমান বাংলাদেশে আমরা বাস করি যেখানে নীতি নৈতিকতার এক চরম দুর্ভিক্ষের মধ্যে আমরা এখন বাস করি। সেই তুলনায় বাবার প্রিন্সিপ্যাল ও মোরালিটি ছিলো লেজেন্ডারী।
একটা ঘটনা আমার খুব মনে পড়ে যখন আমার বয়স সম্ভবত ৭ বা ৮ হবে। আমরা থাকি খুলনায়। বাবা তখন খুলনা আর্ট কলেজের প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপ্যাল। যতদুর মনে আছে বাসায় কেউ একজন খুব দামী কোন বিদেশী চকলেটের বক্স নিয়ে এসেছিলো কোন ধরনের ফেভার পাওয়ার জন্য। ওইরকম দামী চকলেট কেনা তো দুরের কথা, কখনো দেখারও সুযোগ হয়নি তখন আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থায়।
কিন্তু কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট থেকে আমার স্পষ্ট মনে আছে সেই চকলেটের বাক্সটা উচুঁ আলমারীর তাকের মাথায় তুলে রাখা হয়েছিলো এবং নিষেধাজ্ঞা ছিলো সেটা ধরার। পরে সেটা যে দিয়েছিলো তাকেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। কেউ আমাকে সেটা ব্যাখ্যা করে বুঝায় নি। কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট কি! কেউ বোঝায় নি কোন কোন পদে থাকলে, উপধৌকন নেওয়া যায় না। কিন্তু আমার ৭, ৮ বছরের মন ঠিকই বুঝে নিয়েছিলো আমার বাবাই সঠিক।
সেই এপিসোড বাবার হাই প্রিন্সিপ্যাল স্বভাবের একটা মাত্র উদারহন। এডিমিনিস্ট্রেশন চালানো থেকে শুরু করে স্টাফদের নিয়োগে ১০০০% সৎ থাকার প্র্যাক্টিস তার মধ্যে সবসময় ছিলো। নীতিবোধ, কারো প্রতি অন্যায় না হতে দেওয়ার চর্চা আমার বাবার কাছে যেভাবে দেখেছি, আমার জানা মতে ততটা সৎ মানুষ আমার জীবনে আমি এক হাতের আঙ্গুলে গুণে ফেলতে পারবো।
আমার বাবার জীবন থেকে এই প্রাপ্তি আমার জীবনের সেরা পাওয়া।
৩.
আমার বাবা মা দুজনেই শিক্ষকতা করে আমাদের বড় করেছেন। আমাকে ছোট বেলা থেকেই এই ধারনা দেওয়া হতো যে আমাদের ইনকাম নির্দিষ্ট। তাদের কনজারভেটিভ ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট আমাকের আমার এন্টারপ্রেনার লাইভের অন্যতম কোর পিলার যা আমার পথ চলায় খুব সাহায্য করেছে।
আশেপাশে যখন অন্যদের মানি ম্যানেজমেন্ট স্কিল এবং ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসি খুব অদ্ভুতভাবে দুর্বল দেখি তখন আমি আরো বেশি এপ্রিসিয়াট করতে পারি আমার বাবা ও মায়ের এই দামী শিক্ষাগুলো। সৎভাবে আয় করা এবং একটা নির্দিষ্ট বাজেটের মধ্যে সংসার চালাতে হয়, খুব কম বাবা মায়েরাই তার সন্তানদের ছোট বেলায় সেই শিক্ষাকে তাদের সন্তানদের মধ্যে আত্নস্থ করাতে পারে। আমি সৌভাগ্যবান।
৪.
আমি যখন হাই স্কুলে পড়ি, ৯০ এর দশকের শুরুতে; তখন আমরা থাকতাম পুরান ঢাকায়, লক্ষীবাজারে। আমার স্কুল ছিলো এককালের বিখ্যাত সেন্ট গ্রেগরী হাই স্কুল। সে সময়ে আমাদের বাসার কাছে ভিডিও গেমের দোকান ছিলো এবং আমার মতো কিশোরদের জন্য সেগুলো ছিলো খুব আকর্ষনের জায়গা। ঘন্টার পর ঘন্টা আমরা সেখানে কনসোলে বিভিন্ন গেম খেলতাম।
আমার ভীষন রকমের সচেতন বাবা তখন ৯২-৯৩ সালের দিকে আমাকে ভিডিও গেমের দোকান থেকে ঘরমুখী করার জন্য একটা অকল্পনীয় কাজ করে ফেললো। আমাদের টানাটানির সংসারে সে সেই সময়ে ৮০,০০০ (আশি হাজার টাকা) দিয়ে আমার জন্য একটা পিসি কিনে আনলেন। ইন্টেল পেন্টিয়াম ডিএক্স ২।
১৪-১৫ বছরের কিশোর আমার জন্য সেটা খুব তাৎপর্যপুর্ন অভিজ্ঞতা ছিলো। সেই সময়ে কারো বাসায় পার্সোনাল কম্পিউটার থাকতে পারে, তাও আমাদের মতো আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে, সেটা প্রায় অসম্ভব। আমরা যে ধরনের সীমিত মাসিক ইনকামের পরিবার ছিলাম, আমার ধারনা বাংলাদেশে আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারে আর কেউ স্কুলে পড়া ছেলের জন্য পার্সোনাল কম্পিউটার কেনার কথা ভাবতে পারতো না। বাংলাদেশে কম্পিউটার তখন অনেক বড় বড় কোম্পানীতেও ছিলো না, বাসা বাড়িতে পার্সোনাল কম্পিউটার অনেক দুরের কথা।
কিন্তু আমার বাবার এই দূরদর্শিতা আমার জীবনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাথেয় যা আমার নিজের ক্যারিয়ার তৈরীতে অনেক বড় প্রভাব ফেলেছে। বাবার এই দূরদর্শি এবং আউট অফ দি বক্স চিন্তাভাবনা তার জীবনের প্রতিটি পর্বেই হাজির ছিলো।
আমার বাবা আমার জীবনে আরেকটি জায়গায় বড় প্রভাব ফেলে গেছেন সেটা হলো রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনার কান তৈরী করে দিয়ে। বাবা নিজে রীতিমতো ওস্তাদ রেখে গান শিখেছেন তার বড় বেলায়। তিনি রেডিওতে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন। আমি বড় হয়েছি সাগর সেন, দেবব্রত বিশ্বাস, সুবিনয় রায় শুনে। তার রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্যাসেটের কালেকশন ছিলো অনেক। সবার গান শুনা এবং গান উপলব্ধি করার সুযোগ হয় না। বাবার কল্যানে এই উপলব্ধির ভূবনে আমার প্রবেশাধিকার তৈরী হয়েছে যা একটি নিয়ামত।
আমার বিশ্ব ধর্ম, তুলনামুলক ধর্মতত্ত্ব এবং ইসলামের বাইরেও অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কে পড়াশুনার আগ্রহ তৈরীর পেছনে প্রধানতম অনুপ্রেরণা ছিলো বাবার কালেকশনের বিভিন্ন বইপত্র। তার ব্যক্তিগত লাইব্রেরী ছিলো আমার ধর্ম বিষয়ে প্রথম একাডেমিক ওরিয়েন্টেশনের জায়গা। তিনি মধ্যযুগে উপমহাদেশের শিল্পকলায় পিএইচডি করার কারনে আমাদের বাসায় স্বাভাবিকভাবেই বৌদ্ধ, হিন্দু ও প্রাচ্যের ধর্মগুলোর বইপত্র হাজির ছিলো। তার নিজেরও ইয়োগা দর্শনের উপর গভীর জ্ঞান ছিলো।
আমার বাবার ভিতরে আরেকটি বিষয় খুব প্রবল ছিলো তা হলো ধর্মীয় হিপ্রোক্রেসির ব্যাপারে প্রবল অপছন্দ। ছোট বেলায় আমি বিষয়টা তেমন বুঝতাম না যে সে কেন ধর্মীয় লেবাসধারী অথচ কপট ও ভন্ড ব্যক্তিদের ব্যাপারে এত কঠিন কথা কেন বলতো। পরে আমি বুঝতে পারি এর তাৎপর্য। বাইরে দাড়ী ও টুপির লেবাস অথচ মানুষের মানবিকতার বেসিক যাদের মধ্যে অনুপস্থিত থাকতো, তাদের ব্যাপারে তার সমালোচনা ছিলো ছুড়ির থেকেও ধাঁরালো।
৫.
আমার বাবার বয়স যখন ১ বছর তখন তিনি পোলিও রোগে আক্রান্ত হন এবং তার একটা পা অন্য পায়ের থেকে দূর্বল ছিলো। কিন্তু এই প্রতিবন্ধকতাকে তিনি সারা জীবন জয় করে এগিয়ে গেছেন। তার এক পা অন্য পা থেকে দূর্বল থাকায় আমার স্মৃতিতে বাবার হাঁটা মানেই একটু খুড়িয়ে হাঁটা। ছোট বেলায় আমি ভাবতাম সবার বাবাই বোধহয় ওভাবে হাঁটে।
পিছনে তাকিয়ে, একটু বড় হয়ে বাবার জীবন সংগ্রামের একটা অধ্যায় ভাবলে আমি খুব অবাক হই। আমার মা সরকারী স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন। মায়ের সরকারী স্কুলে প্রচুর বদলী হতো। আমার মনে আছে আমার মা খুলনা থেকে নারায়নগঞ্জের একটা স্কুলে ট্রান্সফার হয়। বাবা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় যোগ দিয়েছেন। মায়ের সুবিধার কথা চিন্তা করে আমরা তখন থাকি নারায়নগঞ্জে মায়ের স্কুলের কাছে। আমার পোলিও আক্রান্ত বাবা, সেই নারায়গঞ্জ থেকে পাবলিক বাসে দরজায় ঝুলে ঝুলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আবার বাড়ি ফিরে যেতেন। নো কমপ্লেইন। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর।
এরপরে মায়ের বদলী হয় পুরান ঢাকা। আমরা নারায়নগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসি।
৬.
বাবা ছিলেন সত্যিকার অর্থে একজন রেবেল বা বিদ্রোহী। আমার দাদা একজন ধর্মীয়ভাবে কনজারভেটিভ মানুষ ছিলেন, উচ্চ শিক্ষিত। কিন্তু তার ছেলে ৬০এর দশকে আর্ট পড়বেন, এটা তিনি মেনে নিতে পারতেন না। ধর্মীয় দৃষ্টিতে সে সময়ে আর্ট মানে মানুষ আকাঁ, প্রাণী আঁকা, মুর্তি তৈরী করা। মুসলিম পরিবারের সিংহভাগই এ বিষয়গুলোকে ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক বলে বিশ্বাস করতেন। তাই বাবা অনেকটা বাড়ি থেকে পালিয়ে নিজের সিদ্ধান্তে শিল্পকলাকে বেছে নেন।
তাঁর বাকি ভাইয়েরা যেখানে ফ্লাইট লেফটেনেন্ট, ইঞ্জিনিয়ার, বিদেশী ইউনিভার্সিটির প্রফেসর, সরকারী আমলা অথবা ডাক্তার; সেখানে তিনি বেছে নেন তখনকার সময়ে খুব আনকনভেশনাল একটি বিষয়। তার নিজের ভালোলাগা এবং প্যাশনকে এতটা গুরুত্ব দিয়ে সেখানে সর্বোচ্চ মেধার পরিচয় তিনি দিতে পেরেছিলেন। এই একই কারনে আমি যখন পিএইচডি না করার সিদ্ধান্ত নেই এবং নিজের মতো করে নিজের ক্যারিয়ার পারসু করি - তিনি কখনোই আমাকে ভৎসনা করেন নি। বাবা এবং মা দুজনেই এ বিষয়ে অকল্পনীয় উদারতার পরিচয় দেন যার জন্য আমি যার পর নাই কৃতজ্ঞ।
আমার বাবা ড. মো. রফিকুল আলম শিল্পকলার ছাত্রদের জন্য বই লিখেছেন এবং প্রকাশ করে গেছেন ১৯৯৩ সাল থেকে। সরকারী আনুকুল্য, ক্ষমতাবান দলের ফেভার, অর্থের প্রতি টান - কোনটাই তার কাম্য ছিলো না। বরং টাকার অভাবে আমার শিল্পী বাবা দামী অয়েল পেইন্টিংয়ের রঙ প্রয়োজন মাফিক কিনতে পারেন নি, সেটাই ছিলো চলমান বাস্তবতা। তার প্রিয় মিডিয়াম ছিলো ওয়েল অন ক্যানভাস। কিন্তু আমাদের বেশিরভাগ জীবন কেটেছে ভাড়া বাসায় নয়তো সরকারী কোয়াটারে যেখানে বাড়তি স্টুডিও করার মতো কোন রুম তিনি কখনো পান নি। এই দেশে সৎ মানুষেরা বেশি সুযোগ সুবিধা পায় না।
শেষ জীবনে নিজের মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই অবশ্য তার হয়েছিল যেটার জন্য তাঁর এবং মায়ের পেনশনের প্রায় পুরোটাই খরচ হয়ে যায়। আমার বাবা সৌখিনও ছিলেন বটে। টানাটানির সংসারের মধ্যে থেকেও যেমন তিনি আমার জন্য কম্পিউটার কিনে দিতে পেরেছেন, দিয়েছেন - ঠিক তেমনি টানাটানির সংসারে কেমন করে যেন তিনি একটা টলেটা স্টারলেট গাড়িও কিনেছিলেন। পৈত্রিক সুত্রে পাওয়া জমি বিক্রির টাকা থেকে।
আমার বাবার ছিলো শিশুর মতো একটা কৌতুহলী মন। আমার সৌভাগ্য যে তার কম্পিউটারে প্রতি আগ্রহের কারনে আমিই ছিলাম তাঁর কম্পিউটারের শিক্ষক। তিনি বাংলাদেশের শিল্পীদের মধ্যে প্রথম দিককার শিল্পী হবেন যারা কম্পিউটার আর্ট প্র্যাক্টিস করতেন। এশিয়ান ও অন্যান্য আর্ট এক্সিবিশনে দেশের প্রথম শিল্পী হিসেবে তার কম্পিউটার মিডিয়ামে আর্ট তিনি প্রদর্শন করেন।
৭.
আমার বাবা অনেক স্বাস্থ্য সচেতন ছিলেন। কোভিড আক্রান্ত হয়েও তিনি কোভিড সারভাইভ করেন। কিন্তু এটার নিউমোনিয়া ও লাংস ইনফেকশন তাকে কাবু করে ফেলে। বাবা প্রচুর কথা বলতেন, কথা বলতে ভালোবাসতেন।
কিন্তু লাংস ইনফেকশন এতটাই খারাপ ছিলো যে আইসিইউ ভর্তির ১ দিনের মাথায় ডাক্তাররা তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নিতে বাধ্য হন, অর্থাৎ তাঁকে ভেন্টিলেশনের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে স্বাস প্রশ্বাস নেওয়ানো হয়। গলার ভিতরে ভেন্টিলেশন পাইপ মানে তিনি আর কথা বলতে পারেন নাই। এটা আমার এবং আমাদের পরিবারের জন্য খুব কষ্টদায়ক ছিলো।
যেহেতু বাবা খুব সচেতন মস্তিষ্কের মানুষ ছিলেন, আমি হাসপাতালে তাঁর জন্য কাগজ কলম নিয়ে যেতাম যেস সে লিখে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে বা কিছু অসুবিধা হলে জানাতে পারে। যতদিন তাঁর সচেতনতা ভালো ছিলো, ততদিন সে কাগজে লিখে জানতে চাইতো কোথায় আছে, কোন হাসপাতালে, এখন কয়টা বাজে ইত্যাদি। সময়ানুবর্তিতা তার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপুর্ণগুন ছিলো। তার সব কিছু চলতো ঘড়ির কাঁটা ধরে। আইসিউইউতে লাইফ সাপোর্টেও তার মন জানতে চাইতো এখন কয়টা বাজে! আমি কানের কাছে জোরে বলতাম (বয়সের সাথে সাথে তাঁর শোনার ক্ষমতা কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল)। সময়টা শুনে সে নিশ্চিত হতো।
৮.
আমার বাবার জীবনে যে মানুষটার ভুমিকা অপরীম সে হলো আমার মা। বাবা গত ১৫ বছর ধরে অস্টিওপোরোসিস কন্ডিশনের কারনে একরম বেড রিডেন ছিলো। শুধু বিছানা আর ওয়াশরুমের মধ্যে তার চলাচল সীমিত ছিলো। প্লাস বয়সের কারনে সে একেবারে শিশুসুলভ আচরন করতো খাওয়া ও অন্যান্য দৈনন্দিন জীবনযাপনের চাহিদা নিয়ে। সেই আচরনগুলো মাথা পেতে নিয়ে তাঁর সব চাহিদা, কাজ, দেখভাল করার যে উদাহরন আমার মা করেছেন, তার কোন তুলনা হয় না। বাবার কারনে মা ১০টা মিনিট অবসর পেতেন না, এতটাই ডিম্যান্ডিং ছিলেন তিনি। কিন্তু অসম্ভব ধৈর্য্য নিয়ে আমার মা বাবার জীবনের শেষ অধ্যায়ে যে প্রবল ভালোবাসা ও যত্ন দিয়ে তাকে লালন করেছেন, সেটার জন্য আমি মনে করি আমার বাবা খুব সৌভাগ্যবান একজন মানুষ ছিলেন।
রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি সাগিরা।
হে প্রভু, তাঁদের প্রতি রহম করো, যেমন তাঁরা শৈশবে আমাদের লালন করেছেন।
পরম করুনাময়ের কাছে প্রার্থনা, আমার বাবাকে যেন পরকালে শান্তি, মঙ্গলময় ও উচ্চ মাকাম দান করেন। আমার মাকে দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন, হায়াতুন তৈয়বা দান করেন। আমিন।
























Deshkal News-এ নাহিদ হাসানের সাথে বাবার একটা সাক্ষাৎকার:
‘তরুণ শিল্পীদের মনে দেশের জন্য কিছু করার ইচ্ছা থাকতে হবে’এই ইনসাইটটি কি আপনার ভালো লেগেছে?
আপনার মতামত জানান অথবা এই কৌশলগুলো আপনার ব্যবসায় কীভাবে প্রয়োগ করা যায় তা নিয়ে আলোচনার জন্য যোগাযোগ করুন।
যোগাযোগ করুন


