
বনী ইসরাইলের বন্দীত্ব, বাঙালির হাজার বছরের পরাধীনতার মুক্তির দাদা ভাই - ঢাকা পেপারস কলাম
১.
গত ৯ই জুন ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক সিরাজুল আলম খানের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বাধীনতাপরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নেপথ্যে থেকে যাঁরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, সিরাজুল আলম খান তাঁদের মধ্যে অন্যতম। রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি সমধিক পরিচিত ছিলেন ‘দাদাভাই’ এবং ‘রহস্য পুরুষ’ নামে। কখনো জনসমক্ষে এসে ক্ষমতার মঞ্চে দাঁড়াননি, তবু দশকের পর দশক ধরে তিনি ছিলেন দেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান এক রূপকার ও তাত্ত্বিক।
সিরাজুল আলম খানের জন্ম ১৯৪১ সালের ৬ জানুয়ারি, নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানার আলীপুর গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে অধ্যয়নকালে তিনি গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন ছাত্ররাজনীতিতে। মেধা ও সাংগঠনিক দক্ষতার গুণে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন এবং ষাটের দশকে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব লাভ করেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নকে সাংগঠনিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে সিরাজুল আলম খানের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। ১৯৬২ সালে আবদুর রাজ্জাক এবং কাজী আরেফ আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’, যা গোপন সংগঠন ‘নিউক্লিয়াস’ নামে পরিচিতি পায়। এই সংগঠনের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যই ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা অর্জন।
পাবলিক ফোরামে ৬ দফা, ১১ দফা এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মতো যুগান্তকারী আন্দোলনগুলোতে ছাত্রদের সুসংগঠিত করতে মূল কারিগরের ভূমিকা পালন করেন তিনি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান ছিল প্রত্যক্ষ এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রণাঙ্গনে তিনি ছিলেন 'মুজিব বাহিনী' বা বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ)-এর চারজন প্রধান কমান্ডারের অন্যতম একজন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পাল্টাতে শুরু করে। সদ্য স্বাধীন দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার রূপরেখা ও নীতিগত প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ তৈরি হয়। এই আদর্শিক দ্বন্দ্বের জেরে তৎকালীন ছাত্রলীগ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে, ১৯৭২ সালে সিরাজুল আলম খানের তাত্ত্বিক ও নেপথ্য নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে নতুন রাজনৈতিক দল—জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। বাংলাদেশের স্বাধীনতাপরবর্তী রাজনীতিতে জাসদ এবং সিরাজুল আলম খানের ভূমিকা নিয়ে নানা বিতর্ক ও আলোচনা থাকলেও, রাজনৈতিক ইতিহাসে এই অধ্যায়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
সিরাজুল আলম খানের political জীবনের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো তাঁর আড়ালে থাকার প্রবণতা। তিনি কখনোই সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী হওয়ার মতো কোনো আনুষ্ঠানিক পদে আসীন হননি। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও সবসময় পর্দার আড়াল থেকে রাজনৈতিক কলকাঠি নাড়তেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন তিনি। আর এ কারণেই দেশের রাজনীতিতে তিনি ‘রহস্য পুরুষ’ হিসেবে আখ্যায়িত হন।
জীবনের শেষ দশকগুলোতে তিনি রাজনীতি থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নেন এবং একপ্রকার নিভৃত জীবনযাপন করতে শুরু করেন। অবশেষে দীর্ঘ রোগভোগের পর, ২০২৩ সালের ৯ জুন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮২ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বর্ণাঢ্য ও রহস্যময় অধ্যায়ের।
২.
ইতিহাসে এমন কিছু ক্ষণজন্মা মানুষের আবির্ভাব ঘটে, যাঁরা একটি জাতির রাজনৈতিক ও আত্মিক মুক্তির ত্রাতা হিসেবে অবতীর্ণ হন। সিরাজুল আলম খান ছিলেন বাঙালি জাতির জন্য ঠিক তেমনই এক ত্রাতা। তাঁকে বাঙালি জাতির ‘মসিহ’ (Messiah) বা মুক্তিদাতা হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়।
সিরাজুল আলম খানকে ‘মসিহ’ হিসেবে অভিহিত করার বিষয়টি অনেকের কাছেই কৌতূহলোদ্দীপক মনে হতে পারে। সাধারণ অর্থে শব্দটি উচ্চারিত হলেই কোনো ঐশ্বরিক বা অলৌকিক মহাপুরুষের প্রতিচ্ছবি কল্পনায় ভেসে ওঠে। তবে এই আলোচনায় শব্দটি প্রচলিত ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং একটি জাতির ‘মুক্তিদাতা’ বা রূপকার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে ‘মসিহ’ হলেন এমন এক যুগনায়ক, যিনি চরম রাজনৈতিক সংকট ও পরাধীনতার ঘোর অমানিশায় নিমজ্জিত জাতিকে মুক্তির সুনির্দিষ্ট পথরেখা নির্দেশ করেন। মূলত এই ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্যেই সিরাজুল আলম খান বাঙালি জাতির অনন্য মুক্তিদাতা।
মানব ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বঞ্চনা ও দাসত্বের ইতিহাস কীভাবে একটি জাতির আত্মপরিচয় ও বৈশ্বিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করে। বনী ইসরাইল বা ইহুদি জাতির ইতিহাস এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ধর্মীয় গ্রন্থ ও ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখা যায়, বনী ইসরাইলের বন্দীত্ব ও জুলুমের ইতিহাস মূলত দুটি বড় ভাগে বিভক্ত। বাইবেলের 'বুক অব এক্সোডাস' ও 'জেনেসিস' (১৫:১৩)-এর বিবরণ এবং ঐতিহাসিক স্কলারদের মতে, প্রাচীন মিশরে তাদের দাসত্ব ও বন্দীত্বের সময়কাল ছিল আনুমানিক ৪০০ বছর। পরবর্তীতে খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৬ সালে ব্যাবিলনীয় রাজা নেবুচাদনেজারের জেরুজালেম দখলের পর তারা ব্যাবিলনে নির্বাসিত হয়, যার মেয়াদ ছিল ঠিক ৭০ বছর (জেরেমিয়াহ ২৫:১১-১২)।
ঐতিহাসিক মানদণ্ডে এই বন্দীত্বের সময়কাল খুব দীর্ঘ না হলেও, তাদের এই বঞ্চনা ও মুক্তির আখ্যান মানব ইতিহাসে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে, তা কেবল তিনটি প্রধান ধর্মের কেন্দ্রবিন্দুতেই পরিণত হয়নি, বরং আধুনিক বিশ্বরাজনীতি বা জিও-পলিটিক্সেরও অন্যতম প্রধান নিয়ামক।
কিন্তু ইতিহাসের এক বিস্ময়কর বৈপরীত্য আমরা দেখতে পাই বাঙালি জাতির ক্ষেত্রে। বনী ইসরাইলের কয়েকশ বছরের বন্দীত্বের চেয়েও বাঙালির পরাধীনতার ইতিহাস ছিল বহুগুণ দীর্ঘ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন। পাল সাম্রাজ্যের পতনের পর থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত—সেন, তুর্কি, আফগান, মোগল, ব্রিটিশ এবং সবশেষে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী—প্রায় ১১০০ বছর বাঙালি জাতি বিদেশি বা বহিরাগতদের দ্বারা পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিল। নিজেদের মাটি, সম্পদ ও অধিকার থাকা সত্ত্বেও হাজার বছর ধরে বাঙালি ছিল নিজস্ব ভূখণ্ডে শাসিত ও শোষিত এক শ্রেণি। এত দীর্ঘ সময় ধরে একটি জাতির পরাধীন থাকার ইতিহাস পৃথিবীতে বিরল। অথচ, বাঙালির এই দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস বৈশ্বিক পরিসরে বনী ইসরাইলের আখ্যানের মতো এতটা আলোচিত হয়নি।
বনী ইসরাইলকে মিশরের দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে যেমন মোজেস বা মুসার মতো ত্রাণকর্তার প্রয়োজন হয়েছিল, তেমনি এক সহস্রাব্দের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে বাঙালি জাতির প্রয়োজন ছিল এমন এক political রূপকারের, যিনি ঘুমন্ত জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করবেন। আর এখানেই ইতিহাসের এক অনন্য চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হন সিরাজুল আলম খান।
বাঙালির রাজনৈতিক মুক্তির এই মহানায়ক কোনো পৌরাণিক চরিত্র ছিলেন না, ছিলেন এক আধুনিক ও দূরদর্শী রাজনৈতিক তাত্ত্বিক। ১৯৬২ সালে যখন পাকিস্তানি জান্তার নিষ্পেষণে জাতি দিশেহারা, তখন সিরাজুল আলম খান গঠন করেন ‘নিউক্লিয়াস’। এই গোপন সংগঠনটিই ছিল বাঙালির স্বাধীনতার মূল বীজতলা। বনী ইসরাইলের মুক্তিদাতারা যেমন তাদের জাতিকে একটি প্রতিশ্রুত ভূমির (Promised Land) স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, সিরাজুল আলম খানও তেমনি স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র, জাতীয় পতাকা এবং জাতীয় সঙ্গীতের রূপরেখা চূড়ান্ত করে তরুণ সমাজকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন।
তিনি কেবল একজন সংগঠক ছিলেন না, ছিলেন ১১০০ বছরের পরাধীনতার মনস্তাত্ত্বিক শেকল ভাঙার প্রধান কারিগর। তাঁর সৃষ্টি করা ‘মুজিব বাহিনী’ এবং ছাত্র-তরুণদের রাজনৈতিক জাগরণই ১৯৭১ সালে বাঙালির জন্য ‘বাংলাদেশ’ নামক স্বাধীন ভূখণ্ড এনে দেয়।
বনী ইসরাইলের মুক্তির ইতিহাস হয়তো ধর্মগ্রন্থের পাতায় বা আধুনিক জিও-পলিটিক্সের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে, কিন্তু ১১০০ বছরের পরাধীনতার অবসান ঘটিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নির্মাণের যে রাজনৈতিক দর্শন ও কাঠামো তিনি তৈরি করে দিয়েছিলেন, তা বাঙালির ইতিহাসে এক মহাকাব্যিক অর্জন। তিনি ক্ষমতার মঞ্চে আসেননি বা পাদপ্রদীপের আলো খোঁজেননি, কিন্তু নীরবে নিভৃতে হয়ে উঠেছিলেন বাঙালি জাতির রাজনৈতিক মুক্তির অবিসংবাদিত কারিগর।
দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষদের ত্রিকালদর্শী হতে হয়। তাঁরা ইতিহাসেরও ইতিহাস দেখতে পান। সাধারণের কাছে যা ভবিষ্যৎ, সেটি পেরিয়ে তাঁরা ভবিষ্যতের ভবিষ্যৎ দেখতে পান। সিরাজুল আলম খান ছিলেন সত্যিকার অর্থেই একজন ত্রিকালদর্শী। আমাদের প্রচলিত রাজনীতিতে যেখানে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির অর্জনকে খুব সংকুচিত করে আলোচনা করা হয়, সেখানে সিরাজুল আলম খানের দর্শন সব সময় হাজার বছরের ক্যানভাসে আবর্তিত হতো। একটা জাতি নিজের গৌরবোজ্জ্বল অতীত, অর্জন ও সভ্যতায় তার স্থান না জানলে সে কখনো সুন্দর ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারে না। তিনি সেই ব্যতিক্রমী ত্রিকালদর্শীদের অন্যতম, যিনি বাঙালি জাতি নিয়ে ভাবতে গিয়ে কখনোই কেবল ৫০ বছরের টাইমলাইনে আমাদের সীমিত করতে চাননি।
ষাটের দশকে বাঙালি জাতির জন্য কী করণীয়, সেই সময়ের স্পিরিটের যে আহ্বান, তা তিনি সবচেয়ে গভীরভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন এবং একজন চূড়ান্ত স্ট্র্যাটেজিক লিডারের জায়গায় পৌঁছে কাজগুলো সুচারুরূপে সম্পন্ন করেছিলেন।
৩.
ষাটের দশকের সেই শ্বাসরুদ্ধকর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকে দৃষ্টিপাত করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সীমাহীন শোষণে জাতি যখন দিশেহারা এবং আইয়ুব খানের সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি উচ্চারণ করাও যখন ছিল একপ্রকার আত্মহত্যার শামিল, তখন সিরাজুল আলম খান কোনো অলৌকিক শক্তির অপেক্ষায় কালক্ষেপণ করেননি। বরং তিনি নিজেই কাঙ্ক্ষিত ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। বস্তুত, একজন প্রকৃত মুক্তিদাতার প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি জাতিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেন, কিন্তু নিজে কখনোই ক্ষমতার মোহ বা সিংহাসনের আকাঙ্ক্ষা লালন করেন না। তাঁর নির্মোহ জীবন এই ঐতিহাসিক সত্যেরই অনন্য দৃষ্টান্ত।
পরাধীনতার গ্লানি মুছে ফেলে মুক্তির স্বাদ গ্রহণের মধ্য দিয়েই একটি জাতির প্রকৃত জন্ম হয়। আর বাঙালির এই মুক্তির বীজ যিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে সযত্নে বপন করেছিলেন, তিনি সিরাজুল আলম খান। ১৯৬২ সালে, যখন বাঙালি কেবল স্বায়ত্তশাসনের স্বপ্ন দেখছে, তখন তিনি অনুধাবন করেছিলেন—নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পাশাপাশি সশস্ত্র বিপ্লবী প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই। ছাত্রসমাজকে স্বাধীনতার মূলমন্ত্রে দীক্ষিত করার যে অসাধ্য সাধন তিনি করেছিলেন, তা বিশ্ব-ইতিহাসে সত্যিই বিরল।
‘দাদাভাই’ খ্যাত এই মহান নেতা ছিলেন যেন গ্রিক পুরাণের প্রমিথিউস, যিনি মাউন্ট অলিম্পাস কাছ থেকে আগুন এনে এক ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। নির্মাণের কাজ নীরবে করতে হয় বলেই তিনি কখনোই পাদপ্রদীপের আলোয় আসতে চাননি। স্বাধীন বাংলাদেশের যে প্রতীকগুলো আজ আমরা দেখি, তা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এসবের নেপথ্যে ছিল সিরাজুল আলম খান ও তাঁর সৃষ্ট ‘নিউক্লিয়াস’-এর সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- স্বাধীনতার কালজয়ী স্লোগান ‘জয় বাংলা’ নির্ধারণ।
- স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত লাল-সবুজ পতাকা নকশা।
- জাতীয় সংগীত নির্বাচন।
- ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ইশতেহার প্রণয়ন।
তিনি ছাত্রলীগকে একটি সাধারণ ছাত্র সংগঠন থেকে স্বাধীনতার অগ্রগামী বাহিনীতে রূপান্তরিত করেছিলেন। দেশব্যাপী নিউক্লিয়াসের শাখা ছড়িয়ে পড়ে, যা বাংলার আনাচে-কানাচে স্বাধীনতার বার্তা পৌঁছে দেয়। চূড়ান্ত লড়াই শুরু হলে বিএলএফ (মুজিব বাহিনী) গঠনের মাধ্যমে তিনি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের যে মনস্তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক ও সামরিক রূপরেখা প্রণয়ন করেছিলেন, তা তাঁর অসামান্য সাংগঠনিক দক্ষতারই প্রমাণ। তিনি জানতেন, কেবল আবেগ দিয়ে নয়, যুদ্ধ জয় করতে হয় নিখুঁত কৌশল ও রাজনৈতিক দর্শনের জোরে।
৪.
একজন প্রকৃত রাজনৈতিক দিশারী কেবল স্বাধীনতাই এনে দেন না, ভবিষ্যতের স্বপ্নও দেখান। সিরাজুল আলম খান বিশ্বাস করতেন, মানুষের মুক্তি কেবল ভৌগোলিক স্বাধীনতায় সীমাবদ্ধ নয়; কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষ অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে মুক্তি না পেলে স্বাধীনতার প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধিত হয় না।
এ কারণেই স্বাধীনতার পর ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে আসীনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি স্বেচ্ছায় নিজেকে সরিয়ে নেন এবং বেছে নেন শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার কণ্টকাকীর্ণ পথ। আজীবন এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন, যেখানে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। পদমর্যাদা, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বা আর্থিক সুবিধা—কোনোকিছুই তাঁকে প্রলুব্ধ করতে পারেনি।
সিরাজুল আলম খানের মতো দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গির দেখা সমকালীন রাজনীতিতে মেলা ভার। তিনি বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার অভিনব রূপরেখা দিয়েছিলেন:
- বৃহত্তর অর্থনৈতিক করিডোর: বাংলাদেশ, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সেভেন সিস্টার্স এবং চীনের কুনমিং প্রদেশকে কেন্দ্র করে তিনি যে 'গ্রেটার ইকোনমিক করিডোর'-এর ধারণা দিয়েছিলেন, তা তাঁর অসাধারণ অর্থনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচায়ক।
- স্থানীয় শিল্পায়ন: দেশের প্রতিটি অঞ্চলে স্থানীয় শিল্প এলাকা গড়ে তোলার যে রূপরেখা তিনি ভেবেছিলেন, তা মূলত বাংলাদেশকে একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করার অব্যর্থ কৌশল।
অদলীয় রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ
তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো 'অদলীয় রাজনীতি'র ধারণা। সমাজ বাস্তবতায় দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি অদলীয় রাজনীতির তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রয়োগ অপরিহার্য। দেশ শাসনে দলীয় রাজনীতি আবশ্যিক শর্ত হলেও তা মূলত একমুখী। অন্যদিকে, সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর শ্রম, কর্ম ও পেশাভিত্তিক বৈচিত্র্যের কারণে অদলীয় রাজনীতি একটি প্রয়োজনীয় শর্ত হয়ে ওঠে। তাঁর এই আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক তত্ত্ব আজও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। এছাড়া, ‘অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ’ এবং তা থেকে উত্তরণের উপায় অনুধাবন করতে হলেও সিরাজুল আলম খানের রাজনৈতিক দর্শনের কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে।
আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতায় জাতীয় ইতিহাসে সিরাজুল আলম খানকে নিয়ে আরও উন্মুক্ত আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। রাষ্ট্র ও সমাজকে উন্নত জাতি হিসেবে পুনর্গঠিত করতে তাঁর চিন্তা, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও দর্শন এখনও প্রাসঙ্গিক। তাঁর প্রয়াণ দিবসে ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাই একজন নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিককে, যিনি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন না, ছিলেন বাঙালির চেতনা ও স্বাধীনতার এক অবিচল ধ্রুবতারা।
Credit: ঢাকা পেপারস
Bu öngörüyü beğendiniz mi?
Düşüncelerinizi paylaşın veya bu stratejilerin işletmenize nasıl uygulanacağını tartışmak için bizimle iletişime geçin.
İletişime Geçin


