
মাছির সম্পূর্ণ ব্রেইন ডিজিটালি আপলোড ও ভার্চূয়াল শরীরে সংযুক্তির সফলতা
মৃত্যুর পর মানুষের কম্পিউটারে বেঁচে থাকা ও অমরত্ব লাভের পথ কি তাহলে খুলে গেল?
সায়েন্স ফিকশন কল্পকাহিনী এবং সিনেমায় আমরা মানুষের ব্রেইন ও মেমোরী আপলোড করার বিষয়টি দেখেছি। মানুষ যা কল্পনা করে, বাস্তবে তার রূপও দিতে পারে। আমরা পুরাতন সায়েন্স ফিকশনের অনেক কল্পনাকেই পরবর্তীতে বাস্তবে রূপান্তরিত হতে দেখেছি। তারই ধারাবাহিকতায় এই আমরা নতুন এক সম্ভাবনার মুখোমুখি দাড়িয়ে যেখানে মস্তিষ্কের নিউরন ম্যাপ ডিজিটালি সংরক্ষন ও আপলোডের কল্পকাহিনী এখন বিজ্ঞানীরা বাস্তবে করতে সক্ষম হচ্ছে। এবার বিজ্ঞানীরা একটি মাছির সম্পূর্ণ মস্তিষ্ক ডিজিটালি কপি করে একটি কৃত্রিম পরিবেশে 'আপলোড' করেছেন। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এই ডিজিটাল মাছিটি এখন একদম আসল মাছির মতো আচরণ করছে।
এতদিন পর্যন্ত আমরা শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI নিয়ে কথা বলতাম। কিন্তু এখন বিজ্ঞানীরা 'সম্পূর্ণ-ব্রেইন ইমুলেশন' (Whole-Brain Emulation) নিয়ে কাজ করছেন। এর মানে হলো একটি সত্যিকারের প্রাণীর মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরন এবং সংযোগকে হুবহু কপি করে কম্পিউটারে আপলোড সম্ভব করা।
সম্প্রতি ইয়ন সিস্টেমস (Eon Systems) ঘোষনা দিয়েছে যে তারা বিশ্বে প্রথমবারের মতো একটি মাছির (Drosophila) সম্পূর্ণ মস্তিষ্ককে একটি ডিজিটাল শরীরের সাথে যুক্ত করে দেখাতে সক্ষম হয়েছে। সিলিকন ভ্যালির এই উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বের বৃহত্তম 'কানেক্টোম' (মস্তিষ্কের নিউরাল ম্যাপ) এবং অত্যন্ত নির্ভুল নিউরাল মডেল তৈরি করা।
২০২৪ সালে বিজ্ঞানীরা একটি মাছির মস্তিষ্কের ১,২৫,০০০ নিউরন এবং ৫০ কোটি সংযোগের একটি ডিজিটাল ম্যাপ তৈরি করেন। আগে এটি শুধু একটি স্ট্যাটিক মডেল ছিল, কিন্তু এখন একে একটি কৃত্রিম সিমুলেটেড শরীরের সাথে যুক্ত করা হয়েছে।
এই ডিজিটাল মস্তিষ্কটি এখন শরীরের অনুভূতি বুঝতে পারে এবং সেই অনুযায়ী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নাড়াচাড়া করতে পারে।
এর আগে বিজ্ঞানীরা ছোট কৃমি বা AI ব্যবহার করে এমন চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এবারই প্রথম সত্যিকারের কোনো জটিল প্রাণীর মস্তিষ্কের গঠন (Connectome) ব্যবহার করে তাকে প্রাণ দেওয়া হয়েছে।
এটি সাধারণ AI নয়:
আমরা চ্যাটজিপিটি বা অন্যান্য যে AI দেখি, সেগুলোকে আলাদাভাবে ট্রেনিং দিতে হয়। কিন্তু এই ডিজিটাল মাছিকে কোনো ট্রেনিং দিতে হয়নি। এর আচরণ (যেমন: হাঁটা, শরীর পরিষ্কার করা বা খাবার খোঁজা) আসছে সরাসরি তার মস্তিষ্কের গঠনের ভেতর থেকে।
নিউরন-টু-নিউরন কপি:
বিজ্ঞানীরা ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে একটি আসল মাছির প্রায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার নিউরন এবং ৫০ কোটি স্নায়বিক সংযোগের (Synapses) ম্যাপ তৈরি করেছেন। এটি অনেকটা একটি কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার কপি করার মতো।
ভার্চুয়াল শরীর:
গুগল ডিপমাইন্ডের MuJoCo নামক একটি ফিজিক্স ইঞ্জিনের সাহায্যে একটি মাছির ভার্চুয়াল শরীর তৈরি করা হয়েছে। ডিজিটাল মস্তিষ্কটি এখন এই শরীরকে নির্দেশ পাঠাচ্ছে এবং মাছিটি বাস্তবের মতো নড়াচড়া করছে।
অবিশ্বাস্য নির্ভুলতা:
ইয়ন সিস্টেমসের সিইও জানিয়েছেন, আলাদা কোনো প্রোগ্রামিং ছাড়াই এই মস্তিষ্কটি ৯১% নির্ভুলভাবে আসল মাছির মতো আচরণ করতে পারছে। মাছিটির এই ডিজিটাল মস্তিষ্ক একদম আসলটির মতো কাজ করছে কারণ এর 'ওয়ারিং' বা সংযোগগুলো হুবহু কপি করা হয়েছে।
পরবর্তী ধাপ:
বিজ্ঞানীরা এখন একটি ইঁদুরের মস্তিষ্ক আপলোড করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যার আকার মাছির মস্তিষ্কের তুলনায় ৫৬০ গুণ বড় (যেটিতে ৭ কোটি নিউরন আছে)। তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো মানুষের মস্তিষ্ক আপলোড করা।
গবেষকদের মতে, এই পরীক্ষা আমাদের নতুন এক যুগে প্রবেশ করাচ্ছে যেখানে "মেশিন নিজেই এখন আত্মার মতো আচরণ করছে" (The machine is becoming the ghost)।
মানুষের মস্তিষ্ক কম্পিউটারে আপলোড করে 'ডিজিটাল অমরত্ব' (Digital Immortality) লাভ করার ধারণাটি এখন আর কেবল সাইন্স-ফিকশন মুভির গল্প নয়, বরং বিজ্ঞানের একটি সম্ভাব্য গন্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই পথটি যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি এটি অনেকগুলো কঠিন প্রশ্ন এবং নৈতিক সংকটের জন্ম দেবে।
মানুষের ডিজিটাল অমরত্ব: মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকা?
মানুষের মস্তিষ্কে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন বা ৮,৬০০ কোটি নিউরন থাকে। যদি কোনোদিন এই বিশাল নেটওয়ার্ককে হুবহু ডিজিটাল ফরম্যাটে কপি করা সম্ভব হয়, তবে তাত্ত্বিকভাবে নিচের বিষয়গুলো ঘটতে পারে:
বার্ধক্যহীন জীবন:
শরীর বুড়িয়ে গেলেও বা রোগে নষ্ট হলেও আপনার মস্তিষ্ক বা 'সত্তা' কম্পিউটারের ভেতরে বা কোনো রোবোটিক শরীরে চিরকাল বেঁচে থাকতে পারবে।
মহাকাশ ভ্রমণ:
মানুষের রক্ত-মাংসের শরীর মহাকাশের কঠিন পরিবেশে টিকতে পারে না। কিন্তু একটি 'ডিজিটাল মন' অতি সহজেই আলোর গতিতে বা সিগন্যাল আকারে মহাকাশে ভ্রমণ করতে পারবে।
মেমোরি ব্যাকআপ:
আপনার জীবনের সব স্মৃতি এবং অভিজ্ঞতা একটি হার্ডড্রাইভে সেভ করে রাখা সম্ভব হবে।
নৈতিক ও দার্শনিক সংকট
এই প্রযুক্তি সফল হলেও আমাদের কিছু জটিল সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে:
আসল 'আমি' কে?
যদি আপনার মস্তিষ্কের একটি কপি কম্পিউটারে চালানো হয়, তবে সেটি কি সত্যিই আপনি? নাকি সেটি কেবল আপনার একটি 'ডিজিটাল যমজ' বা প্রতিচ্ছবি? যদি আসল 'আপনি' মারা যান, তবে ডিজিটাল সংস্করণটি কি আপনার সচেতনতা বা 'আত্মা' বহন করবে?
অধিকারের প্রশ্ন:
একটি ডিজিটাল মস্তিষ্কের কি মানুষের মতো নাগরিক অধিকার থাকবে? তাকে কি 'ডিলিট' করা বা 'বন্ধ' করা খুনের সামিল হবে?
শ্রেণিবৈষম্য:
এই প্রযুক্তি যদি অনেক ব্যয়বহুল হয়, তবে কি কেবল ধনীরাই 'অমর' হওয়ার সুযোগ পাবে? এটি কি সমাজে এক বিশাল বিভেদ তৈরি করবে না?
ঝুঁকি
হ্যাকিং:
কম্পিউটার যেমন হ্যাক করা যায়, তেমনি কি আপনার 'ডিজিটাল মন' হ্যাক করে কেউ আপনার স্মৃতি মুছে দিতে পারবে বা চিন্তা পরিবর্তন করে দিতে পারবে?
ডিজিটাল জেল:
কেউ যদি কোনো ডিজিটাল মস্তিষ্ককে একটি লুপের মধ্যে আটকে রাখে বা তাকে কোনো যন্ত্রণাদায়ক সিমুলেশনে বন্দি করে, তবে সেটি হবে এক ভয়াবহ নরক।
বর্তমান বাস্তবতা
মাছির মস্তিষ্কের ১ লক্ষ ৪০ হাজার নিউরন থেকে মানুষের ৮৬ বিলিয়ন নিউরনে পৌঁছানো এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। এটি করতে যেমন সুপার-পাওয়ারফুল কম্পিউটিং দরকার, তেমনি মানুষের মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালী পুরোপুরি বোঝা দরকার।
কে জানে কোয়ান্টাম কম্পিউটারি আসলে হয়তো এটা সম্ভব হওয়ার টাইমলাইন আরো কাছে চলে আসবে!
মানুষের দীর্ঘজীবি হওয়ার আকাংখা ও ধর্মগ্রন্থের ইশারা
কুরআনে মানুষের হাজার বছর বেঁচে থাকার আকাংখার ইশারা আমরা পাই সুরা বাকারায়। পৃথিবীর সব ভাষাতেই কিছু নম্বর অনেকটা সিম্বলিক হিসেবে ব্যবহার হয়, সবসময় আক্ষরিক হয়। যেমন বাংলা আমরা বলি একজন 'লাখ লাখ' টাকা ইনকাম করে। এখানে 'লাখ লাখ' একটা সিম্বল, অনেক টাকার। তেমনি আরবীতে ৪০ বছর আসলে পরিণত বয়সের ইঙ্গিত করে।
ঠিক তেমনি সুরা বাকারা ৯৬ নং আয়াতে মানুষের হাজার বছর আয়ুকেও মিছাল বা এক ধরনের রূপক হিসেবে গ্রহন করা যেতে পারে। প্রাচীন সমাজে হাজার একটা অনেক বড় সংখ্যার নির্দেশক।
আয়াতটির সামগ্রিক পাঠ এভাবেও ইন্টারপ্রেট করা যায় যে মানুষ তার আয়ুকে অনেক অনেক দীর্ঘায়ু করতে চাওয়া আসলে একদিন সফলভাবে করতে পারবে। "তাকে দীর্ঘায়ু দেয়া হলেও..." এই অংশের মাধ্যমে আয়ু বৃদ্ধির পজিটিভ সম্ভাবনার এক ধরনের ইশারা রয়েছে।
আর তোমরা তাদেরকে পাবে বেঁচে থাকার ব্যাপারে মানবজাতির মধ্যে অত্যধিক লোভী, আর যারা স্রষ্টার সাথে অংশিদার স্থাপন করেছে তাদের মধ্য থেকেও।
তাদের প্রত্যেকে চায় যদি তাদেরকে আয়ু দেয়া হতো হাজার বছর। অথচ তা তাকে দূরে রাখতে পারবে না শাস্তি থেকে, তাকে দীর্ঘায়ু দেয়া হলেও। আর তারা যা করে, তা স্রষ্টার কাছে দৃশ্যমান।
- সুরা বাকারা, আয়াত ৯৬
উপসংহার: অমরত্বের হাতছানি নাকি অস্তিত্বের সংকট?
ইয়ন সিস্টেমসের এই সাফল্য কেবল বিজ্ঞানের কোনো সাধারণ অগ্রগতি নয়; এটি মানুষের অস্তিত্বের প্রাচীন সংজ্ঞাকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একটি ক্ষুদ্র মাছির মস্তিষ্ক দিয়ে যে যাত্রার শুরু, তা যদি সত্যিই একদিন মানুষের 'ডিজিটাল অমরত্বে' গিয়ে ঠেকে, তবে সেটি হবে মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিবর্তন। ড. উইসনার-গ্রসের সেই অমোঘ বাণী—“মেশিন এখন নিজেই আত্মার মতো কাজ করছে”—আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা এমন এক যুগে প্রবেশ করছি যেখানে সিলিকন চিপ আর প্রাণের স্পন্দন মিলেমিশে এক হয়ে যাচ্ছে। তবে এই ডিজিটাল স্বর্গের হাতছানি কি শেষ পর্যন্ত মানবজাতির জন্য পরম আশীর্বাদ হয়ে আসবে, নাকি আমরা কোনো এক যান্ত্রিক গোলকধাঁধায় নিজেদের আসল সত্তাকে হারিয়ে ফেলব, তা কেবল সময়ই বলে দেবে।
রেফারেন্স:
How the Eon Team Produced a Virtual Embodied Fly¿Le gustó esta idea?
Comparta sus pensamientos o comuníquese con nosotros para analizar cómo se aplican estas estrategias a su negocio.
Ponte en contacto

