Skip to main content
আহাম্মক ও বোকাদের থেকে নিজের মনের শান্তি বজায় রাখার প্র্যাকটিক্যাল ফিল্ড গাইড: শোপেনহাওয়ারের শিক্ষা
সবগুলো অন্তর্দৃষ্টি
Philosophy
Personal Growth
Mindset
Life Lessons

আহাম্মক ও বোকাদের থেকে নিজের মনের শান্তি বজায় রাখার প্র্যাকটিক্যাল ফিল্ড গাইড: শোপেনহাওয়ারের শিক্ষা

Sadiq M Alam
লিখেছেন Sadiq M Alam
11 মিনিট পড়তে লাগবে
২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আর্থার শোপেনহাওয়ারকে আমরা চিনি দর্শনের হতাশাবাদী চিন্তক হিসেবে। কিন্তু অন্য চোখে দেখলে তিনি লিখে গেছেন এক দারুণ ব্যবহারিক জীবনদর্শন—সংবেদনশীল মানুষের জন্য, যে পৃথিবীতে শব্দ আর আত্মবিশ্বাসের কদর বেশি, সেখানে নিজেকে আগলে রাখার কৌশল। দুইশ বছর পরেও সেই উপদেশের প্রয়োজন আরও বেশি হয়ে উঠেছে।


আহাম্মকের আহাম্মকি যখন আপনাকে ক্লান্ত করে

দৃশ্যটা চেনা। অফিসের মিটিং, বাড়ির খাবার টেবিল, কিংবা একটা গ্রুপ চ্যাট। সেখানে কেউ একজন যা বোঝে না, সেটা নিয়েই কথা বলছে প্রবল আত্মবিশ্বাসে। বুকে চাপ বাড়তে থাকে। তার যুক্তির ফাঁকটা সঙ্গে সঙ্গে চোখে পড়ে যায় আপনার। তথ্য জোগাড় করেন। সাজিয়ে-গুছিয়ে পেশ করেন—ঠিক যেভাবে চাইতেন, কেউ যেন আপনার সঙ্গে করুক।

তিনি পলক ফেলেন। তারপর আগের চেয়ে আরও জোরে নিজের মতেই অনড় থাকেন।

আপনি ফিরে আসেন শূন্য হয়ে। গভীর রাতে প্রশ্ন জাগে—আসল সমস্যাটা কি আমি নিজেই?

উত্তরটা মুক্তির মতো: না, সমস্যা আপনি নন। সমস্যা হলো প্রত্যাশার মিল নেই। এই সত্যটা শোপেনহাওয়ার দেখেছিলেন দুইশ বছর আগে। বেশির ভাগ মানুষ সত্য খোঁজার জন্য তর্ক করে না। তারা তর্ক করে জেতার জন্য—নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম ডানিং-ক্রুগার প্রভাব।

যাঁর দক্ষতা কম, তিনি নিজের অদক্ষতা বুঝতেই পারেন না, কারণ সেই বোঝার ক্ষমতাটুকুই তাঁর নেই। শোপেনহাওয়ারের কাছে ল্যাব ছিল না, কিন্তু চোখ ছিল। তিনি ইউরোপের কফিহাউস আর লেকচার হলে একই সার্কাস দেখেছেন এবং লিখে গেছেন—কঠিন মানুষের কারণে আমরা যে কষ্ট পাই, তার বড় অংশ আসলে বাস্তবতা আর আমাদের প্রত্যাশার ফারাক থেকে আসে।

গভীর চিন্তাকে যারা মূল্য দেয় না, তাদের কাছ থেকে সেই মূল্য প্রত্যাশা করা বন্ধ করুন। দেখবেন, তাদের আচরণের ক্ষমতা আপনার ওপর কমে গেছে। এই একটা পরিবর্তনই কোনো জেতা তর্কের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।

যারা বেশি দেখে, তারাই বেশি ক্লান্ত

শোপেনহাওয়ার এমন একটা পর্যবেক্ষণ রেখে গেছেন, যা আজও ভীষণ প্রাসঙ্গিক। যারা বুদ্ধিমান, তারা বেশি কষ্ট পায়। দুর্বল বলে নয়—তারা স্পষ্ট দেখে বলে। অন্যদের চোখ এড়িয়ে যাওয়া দ্বন্দ্ব, ভণ্ডামি, অসংগতি—সব দেখে ফেলে তারা। সরল ব্যাখ্যার ভেতরে স্বস্তিতে ঘুমিয়ে থাকে অগভীর মন। আর প্রতিফলিত মনকে লড়তে হয় জটিলতার সঙ্গে। এই লড়াইটাই ক্লান্তিকর।

এই ক্লান্তির পেছনে অহংকার নেই, আছে এক সূক্ষ্ম পার্থক্য। অজ্ঞতা আর মূর্খতা এক জিনিস নয়—এই ফারাকটা শোপেনহাওয়ার স্পষ্ট করে এঁকেছেন। অজ্ঞতা শেখার মাধ্যমে কাটানো যায়; এটা শুধু ভর্তি হওয়ার অপেক্ষায় থাকা এক খালি পাত্র। মূর্খতা অন্য রকম। নিজের মতের সঙ্গে আবেগের বাঁধন, আর সমালোচনামূলক ভাবার অনীহা—এই দুইয়ের মিশেল।

এ কারণেই নির্বোধ মানুষের সঙ্গে তর্ক এত শক্তি শুষে নেয়। তারা সত্য খোঁজে না, খোঁজে স্বীকৃতি। বিশ্বাসে আঘাত লাগলে তারা যুক্তিতে সাড়া দেয় না; জবাব দেয় রাগ, উপহাস কিংবা নৈতিক ক্ষোভ দিয়ে। হাজার বার দেখেছেন—অহংকার যখন সামনে থাকে, তথ্য তখন মন বদলায় না।

সব রোগ নির্ণয় তিনি লিখেছিলেন একটিমাত্র বাক্যে:

"প্রত্যেক মানুষ তার নিজের দৃষ্টির সীমানাকেই পৃথিবীর সীমানা মনে করে।"

বাক্যটা আবার পড়ুন। সীমিত দৃষ্টিকোণ থেকে যে তর্ক করে, সে মন্দ মানুষ নয়। সে সত্যিই তার কাঠামোর বাইরে দেখতে পায় না। এই বোঝার অর্থ এই নয় যে, আপনাকে তার সঙ্গে একমত হতে হবে। অর্থ হলো, তার অন্ধত্বকে ব্যক্তিগত আঘাত হিসেবে নেওয়া বন্ধ করতে পারেন।

যিনি কখনো রং দেখেননি, তিনি সূর্যাস্তের বর্ণনা দিতে পারেন না—এই সহানুভূতিটুকুও তৈরি হতে পারে মনে। ট্র্যাজেডি হলো, এমন মানুষ যে পৃথিবীতে আছে, তা নয়। ট্র্যাজেডি হলো, জানালাহীন ঘরের ভেতর থেকে সূর্যাস্ত দেখা যাবে না—এই সহজ কথা বুঝতেও সংবেদনশীল মানুষের এত শক্তি খরচ হয়ে যায়।

যুক্তির ফাঁদ

এখানেই বুদ্ধিমানরা নিজের পা নিজেই কাটেন। তারা ধরে নেন, যুক্তি একা প্রতিটি দূরত্ব পেরিয়ে যেতে পারে। ব্যাখ্যা যথেষ্ট পরিষ্কার হলে, মানুষ নিশ্চয়ই বুঝবে আর মেনে নেবে। শোপেনহাওয়ার সতর্ক করে দিয়েছিলেন—এই বিশ্বাস শুধু নির্বোধের মতো নয়, বিপজ্জনকও বটে।

কেন? কারণ মানুষ মূলত যুক্তিবাদী প্রাণী নয়। আমাদের চালায় ইচ্ছা, ভয় আর আবেগের বিনিয়োগ। যুক্তি এসব ইচ্ছাকে পথ দেখানোর বদলে, বেশির ভাগ সময় তাদের সেবাই করে। যে মূর্খতার মধ্যে আটকে আছে, সে আসলে তথ্য বুঝতে অক্ষম নয়। সে চায় না, তথ্য তার আত্মবিশ্বাসে ছিদ্র করুক।

তাই যুক্তি তার কাছে হুমকি—এ যেন তার অস্বীকার করা সীমাবদ্ধতাগুলোর সামনে আয়না। আপনি শান্তভাবে ব্যাখ্যা করলেন, সে শুনল আক্রমণ। ভদ্রভাবে দ্বিমত করলেন, সে অনুভব করল অপমান। সংবেদনশীল মানুষটা হয়ে উঠল আয়না—যে ছবিটা দেখতে অন্য পক্ষ নারাজ, সেই আয়নাই আবার ভাঙা হয়। শোপেনহাওয়ার জানতেন, আয়না প্রায়ই ভাঙা হয়।

সব মানুষের যুক্তিবোধকে বাস্তবের চেয়ে বড় করে দেখার ফল বিষণ্নতা। বিষণ্নতা পাক খেয়ে হয়ে ওঠে তিক্ততা। আর তিক্ততা ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দেয় সহানুভূতি। এমন তিক্ত বুদ্ধিজীবী আপনি নিশ্চয়ই চেনেন—যারা নিজেদের হতাশাকে অস্ত্র বানিয়ে সবার ওপর বিরক্তির বিষ ছড়ান। মূর্খদের চেয়েও বেশি সাবধান করেছিলেন শোপেনহাওয়ার এই অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন নিয়ে।

কারণ অবজ্ঞা আগে পোড়ায় তাকে, যে ধারণ করে। অবজ্ঞা আপনার আবেগকে অন্যের আচরণের সঙ্গে বেঁধে রাখে। তখন আপনি নিজের অধীনে থাকেন না, নিছক প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পড়েন।

তাহলে উপায় কী? তর্ক ব্যর্থ, ব্যাখ্যা ক্লান্তিকর, অবজ্ঞা বিষাক্ত—বাকি থাকে কী?

শব্দ: আক্ষরিক আর মানবিক

আওয়াজ নামের বিখ্যাত প্রবন্ধে শোপেনহাওয়ার রেগে গিয়ে লিখেছিলেন এক অবিশ্বাস্য তুচ্ছ বিষয় নিয়ে—শহরের রাস্তায় চাবুকের শব্দ। তিনি লিখেছেন:

"শব্দই সবচেয়ে ধৃষ্টতাপূর্ণ বাধা। এটি শুধু চিন্তার মাঝে বাধা সৃষ্টি করে না, চিন্তাকে ছিন্নভিন্নও করে দেয়।"

আরও স্পষ্ট করে লিখেছেন:

"মানুষের মূর্খতা আর চিন্তাহীনতা কতখানি—চাবুকের শব্দ সহ্য করার এই প্রবণতার মতো এত স্পষ্ট করে আর কিছুতে বোঝা যায় না।"

রাস্তার শব্দে দার্শনিকের মেজাজ হারানো দেখে হাসি পেতে পারে। কিন্তু তিনি গুরুতর একটা কথা বলছিলেন। যারা সারাক্ষণ শব্দ সহ্য করে নিতে পারে, তারা সাধারণত গভীর ভাবনায় ডুবে থাকে না। নীরবতা তাদের ভয় দেখায়, কারণ নীরবতার দাম গভীরতা। একটা ধারালো শব্দই যে শত চিন্তাশীল মানুষের মনোযোগ ভেঙে দিতে পারে—তিনি এটাও লিখেছেন।

শব্দটা কখনোই আসল শত্রু ছিল না। আসল শত্রু ছিল চিন্তার চর্চা ভুলে যাওয়া এক সংস্কৃতি।

তার সেই চাবুকের শব্দকে এ শতকে নিয়ে আসুন। ফোনের নোটিফিকেশন, ব্রেকিং নিউজ, রাগ জাগানোর জন্য বানানো কনটেন্ট, মন্তব্যের ঘরে আত্মবিশ্বাসের কাছে হেরে যাওয়া তথ্য—সব মিলিয়ে মনে হবে যেন সেই প্রবন্ধই আমাদের সময়ের কথা লিখছে। শোপেনহাওয়ার এই অর্থনীতিটাও আগে দেখে গিয়েছিলেন:

"যে বোকাদের জন্য লেখে, তার বড় পাঠকগোষ্ঠী পাওয়া সব সময় নিশ্চিত।"

চিৎকার করে সহজ করে বলা—এটাই দ্রুত শ্রোতা বানানোর চিরকালীন সূত্র। শোরগোল করা নির্বোধ মানুষটাও ওই চাবুকেরই মানবিক সংস্করণ। চিন্তাহীন একজনের একটু হঠকারী কথায় গুঁড়িয়ে যেতে পারে আপনার পুরো দুপুরের মনোযোগ। আপনি যত সংবেদনশীল, এই বাধাগুলো আপনার ভেতরের জগৎকে তত বেশি নাড়া দেয়।

ফাঁপা মনের কাছে শব্দ সমস্যা নয়, কারণ ভেতরে তো নাড়াচাড়া করার মতো কিছুই নেই।

এই রাগের ভেতরেই লুকিয়ে আছে ব্যবহারিক জ্ঞান: শব্দের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক—আক্ষরিক হোক বা মানবিক—আপনার নিজের মনকে কতখানি গুরুত্ব দেন, সেটাই প্রকাশ করে। মনোযোগই জীবনের কাঁচামাল। দুর্লভ সম্পদের মতো একে আগলে রাখুন।

দূরত্ব মানে উদাসীনতা নয়

শোপেনহাওয়ারের দেওয়া ওষুধ শুনতে কঠোর। একে অনেকেই ভুল বোঝেন মানববিদ্বেষ হিসেবে। তিনি বলেছেন নির্বাচিত সরে আসা। মানবসমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়, বরং অপ্রয়োজনীয় সংঘাত থেকে সচেতন দূরত্ব। তিনি নিজে ছিলেন নিভৃতচারী; শত্রুরা বলত, মানুষ ঘৃণা করেন। কিন্তু তার পরামর্শ পড়লে দেখবেন, সেটা আসলে এক ধরনের জরুরি বিভাজন—কী নিয়ে লড়বেন, কী ছেড়ে দেবেন।

প্রতিটি যুদ্ধে লড়তে হবে না। প্রতিটি সত্য বলতে হবে না। প্রতিটি মনেই পৌঁছানো যায় না—এবং একটা পয়েন্ট প্রমাণ করার চেয়ে আপনার শান্তি বড়। শোপেনহাওয়ারের মতে, প্রজ্ঞা অনেক সময় কম বলায়, সংশোধন না করে পর্যবেক্ষণে, বোঝানোর চেষ্টা না করে বোঝার মধ্যে। নিজেকে সৎ প্রশ্ন করুন: কত তর্ক আপনি জিতেছেন, কিন্তু শান্তি হারিয়েছেন?

কত বার সত্যিটা বলার পর নিজেকে শূন্য মনে হয়েছে? এগুলো ব্যর্থতার লক্ষণ নয়। এগুলো ইঙ্গিত—বুদ্ধিকে বিচারবুদ্ধি দিয়ে চালনা করতে না পারলে, সেটাই হয়ে ওঠে আত্মঘাতী।

এখানেই মানুষ শোপেনহাওয়ারকে সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝে। আবেগগত দূরত্ব, তার মতে, অনুভূতির অনুপস্থিতি নয়। এটা অনুভূতিকে বুদ্ধিমানের মতো ব্যবহার করার শৃঙ্খলা। অর্থাৎ যত্ন করতে পারবেন, কিন্তু অন্যের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে নিজের ভেতরের অবস্থা জড়িয়ে ফেলবেন না। সহানুভূতির জন্য কাছে থাকা জরুরি নয়।

কাউকে পুরোপুরি বোঝা যায়, আবার তার বিশৃঙ্খলাকে নিজের আবেগের তালে ঢুকতে না দেওয়াও যায়। দূর থেকে কোনো ঝড়কে দেখার মতো—দূর থেকে শুভ কামনাও করা যায়।

পুরো ব্যাপারটা তিনি এক ছবিতে এঁকেছেন। শীতের রাতে শজারুরা গা ঘেঁষে থাকে উষ্ণতার জন্য; কিন্তু কাঁটা ফুটে যায়, আবার আলাদা হয়ে যায়। বেশি কাছে গেলে রক্তপাত, বেশি দূরে গেলে জমে যাওয়া। জীবনের শিল্প হলো এই দূরত্ব আয়ত্ত করা: মানুষ থাকার মতো কাছে, অক্ষত থাকার মতো দূরে।

যে কোনো তর্কে না বলতে পারে না, যে প্রতিটি ভুল বোঝাবুঝি ঠিক করতেই হবে বলে মনে করে, যে সবার কাছে নিজেকে ব্যাখ্যা করতেই বাধ্য বোধ করে—সে এখনো জানে না, নিজের চামড়া কোথায় শেষ।

একা থাকাটাই নিজের কাছে ফেরা

নির্বাচিত সরে আসা যদি এক পক্ষ হয়, তবে একাকীত্ব অন্য পক্ষ—আর এটা ইতিবাচক। শোপেনহাওয়ার একাকীত্বকে শাস্তি মনে করতেন না। তিনি মনে করতেন, চিন্তাশীল মানুষের পুনরুদ্ধারের জায়গা এটা:

"মানুষ যতক্ষণ একা থাকে, ততক্ষণই সে নিজের মতো থাকতে পারে। যে একাকীত্ব ভালোবাসে না, সে স্বাধীনতাকেও ভালোবাসে না—কারণ একা থাকলেই মানুষ সত্যিকারের স্বাধীন।"

একটু ভাবুন তো এর মানে। মানুষের ভিড়ে আপনি সারাক্ষণ অনুবাদ করে চলেছেন। চিন্তাকে সহজ করে গিলিয়ে দেওয়ার মতো করে সাজান, ধারগুলো ভোঁতা করেন যাতে সমাজে গ্রহণযোগ্য হয়। নিজের বুদ্ধিমত্তাকে ঘরের স্তরে নিয়ে আসার জন্য দর কষাকষি করেন। বছরের পর বছর এমন চললে, মনে থাকেও না যে আদৌ কোনো দর কষাকষি হচ্ছিল।

একাকীত্বে সেই অনুবাদ বন্ধ হয়ে যায়। নিজের কণ্ঠে, নিজের গভীরতায়, দর্শকের ভয়ে ছাড়া সম্পূর্ণ চিন্তা করা যায়। এটা পলায়ন নয়। এটা ওই জায়গা, যেখানে স্পষ্টতা রক্ষা পায়—যেদিন সত্যিই দরকার, সেদিন কাজে লাগানোর জন্য।

মানুষের সঙ্গ হতাশ করলে আরও একটা নীরব সান্ত্বনা রেখে গেছেন শোপেনহাওয়ার। চারপাশের মানুষ যদি কথার স্তরে আপনাকে ছুঁতে না পারে, তবে সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষগুলো এখনও পাওয়া যায় বইয়ের পাতায়। "পুরাতনদের, প্রকৃত ও চিরন্তন পুরাতনদের আগ্রহ নিয়ে পড়ো"—এই এপিগ্রামটি তিনি যৌবনে পেয়েছিলেন, আর সারা জীবন রেখেছিলেন পথপ্রদর্শক হিসেবে।

বই হলো সেই কথোপকথন, যেখানে প্রতিভা আপনাকে কখনো বাধা দেবে না, রাগ করবে না, চাওয়া হবে না আপনি নিজেকে ছোট করুন। চারপাশ হতাশ করলে, মৃত মহানরা চমৎকার সঙ্গ।

জ্ঞানীদের সঙ্গে পথ চলা

এর কোনো অংশই শ্রেষ্ঠত্বের লাইসেন্স নয়। শোপেনহাওয়ার আসলে অনেক পুরোনো, অনেক নম্র একটি কথা বলেছেন—পৃথিবীর সব জ্ঞানী ঐতিহ্যেই যে কথাটা আছে। বাইবেলের প্রবচনও তাই বলে: জ্ঞানীদের সঙ্গে পথ চললে আপনি জ্ঞানী হবেন, কিন্তু বোকাদের সঙ্গী হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

আরও সোজা করে বলা হয়েছে—বোকাকে তার বোকামির মতো জবাব দিও না, নইলে তুমি নিজেই তার মতো হয়ে যাবে।

আমরা ভাবতে ভালোবাসি, পরিবেশ আমাদের ছুঁতে পারে না। পারে না? মোটেই না। মেজাজ ছোঁয়াচে, অভ্যাস ছোঁয়াচে। আপনার চারপাশের মানুষ যেভাবে তর্ক করে, অভিযোগ করে, ভাবে—ধীরে ধীরে আপনি-ও সেভাবে তর্ক করেন, অভিযোগ করেন, ভাবেন। যারা নিজের ভুল ধরতে চায় না, তাদের সঙ্গে সারাদিন গোলকধাঁধার তর্কে কাটালে আপনার মনও ঘুরতে শিখবে সেই বৃত্তে।

আর গভীরতার সঙ্গে সময় কাটালে—সাক্ষাতে হোক বা বইয়ে—আপনার মনও গভীরতার দিকে হাত বাড়াবে। শোপেনহাওয়ার নিজের মানসিক খাদ্যের ব্যাপারে ছিলেন নির্দয় রকমের সচেতন। তিনি জানতেন, উচ্চ বুদ্ধির মানুষ যদি সারাক্ষণ অগভীর মানুষের সংস্পর্শে থাকে, শেষ পর্যন্ত তাকে টেনে নামানো হবে তাদের স্তরে। মন তার পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। পরিবেশটা বেছে নিন, সচেতনভাবে।

এর জন্য আপনাকে অহংকারী হতে হবে না। হতে হবে সতর্ক। বুদ্ধিমত্তা ঘোষণা করার প্রয়োজন নেই; আপনি কী সহ্য করেন আর কী করতে অস্বীকার করেন—সেটাই নিজেকে প্রকাশ করে।

যে আত্মসমর্পণ সত্যিকারের মুক্তি

এবার সেই অন্তর্দৃষ্টি, যা সব বদলে দেয়—এই দর্শনকে কৌশল থেকে মুক্তিতে রূপ দেয়। লক্ষ্য কখনোই পৃথিবীকে সংশোধন করা ছিল না; ছিল পৃথিবীর ভেতরেই অক্ষত থাকা। আপনার অনেক সংঘাত বেঁচে থাকে শুধু এই কারণে যে, আপনি সমাধান করতে থাকেন যা কখনো সমাধানের জন্য তৈরি ছিল না।

যারা ইতিমধ্যে ভুল বোঝার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, তাদের কাছে ব্যাখ্যা করতে থাকেন। যারা বোঝার ক্ষমতাই রাখে না, তাদের কাছ থেকে বোঝার আশা করেন। যুক্ত নয়—এতটুকুই মনে করেন, কাজ হলো।

সমাধান হলো আত্মসমর্পণ। বোকাদের কাছে নয়। তাদের বদলানোর প্রয়োজনটাকে আত্মসমর্পণ।

যে মুহূর্তে বুঝতে পারবেন, যারা বুঝতে পারে না, তাদের বোঝানোর ইচ্ছা ছেড়ে দিয়েছেন—ওজন নেমে যায়। একই আত্মবিশ্বাসী ভুল দেখে রাগের বদলে অনুভব করেন শান্ত পর্যবেক্ষণ। চোখের সামনে খেলা করে বায়াস, আত্মরক্ষায় ব্যস্ত অহংকার।

এগুলো এখন অনুমেয়, আর যা অনুমেয় তা হয় সামলানো যায়, নয়তো উড়ে যেতে দেওয়া যায়। আপনি আর তাদের বিশৃঙ্খলার খেলোয়াড় নন। আপনি দর্শক। দর্শককে কাদায় টেনে নামানো যায় না।

শোপেনহাওয়ারের দর্শন আশাবাদী নয়, কিন্তু সৎ। তিনি এমন পৃথিবীর প্রতিশ্রুতি দেননি, যেখানে বোকামি থাকবে না। দিয়েছেন তার চেয়ে মূল্যবান কিছু: এই পৃথিবীতেই অক্ষত থাকার পথ, তিক্ত না হয়ে গভীরতা রক্ষার পথ, নিঃসঙ্গ না হয়ে চিন্তাশীল থাকার পথ। বোকামি আপনার চারপাশে থাকবেই। পার্থক্য হলো, সেটা আর আপনার ভেতরে থাকবে না।

প্রতিভা নিয়ে তাঁর একটি বিখ্যাত উক্তি আছে, যা এই নিঃশব্দ উচ্চাকাঙ্ক্ষার ক্ষেত্রেও খাটে:

"প্রতিভা সেই লক্ষ্যে আঘাত করে, যা অন্য কেউ আঘাত করতে পারে না; জিনিয়াস সেই লক্ষ্য দেখে, যা অন্য কেউ দেখতেই পায় না।"

সবাই যেই লক্ষ্যে গুলি ছোড়ে, সেটাই লক্ষ্য করবেন না—শেষ কথা, প্রকাশ্য জয়, এমন লোকদের করতালি, যারা যাই হোক একমত হত না। শুধু আপনি যে লক্ষ্য দেখতে পান, সেটাই লক্ষ্য করুন। আপনার শান্তি, আপনার গভীরতা, আপনার একটাই দুর্লভ মনোযোগ। সর্বোচ্চ বুদ্ধিমত্তা কখনো অন্যের জয়ে ছিল না; ছিল নিজেকে আয়ত্ত করার মধ্যে।

ভেতরের সেই আশ্রয়টা গড়ে তুলুন, পাহারা দিন, আর এতটা সময় সেখানে কাটান যেন পৃথিবীর শব্দ হয়ে ওঠে যা ছিল—আকাশের আবহাওয়া, আপনার আত্মার জলবায়ু নয়।


ইংরেজি প্রবন্ধ "Your Peace Is Worth More Than Being Right" অবলম্বনে রচিত।

প্রেরণা: আর্থার শোপেনহাওয়ার নিয়ে তিনটি ভিডিও প্রবন্ধ—"How Intelligent People Deal with Stupid People" (Mindplicit), "How Intelligent People Should Deal with Stupid People" (The Psyche) এবং "Why Smart People Must Stay Away From Stupid People" (PhiloNautica)।

সরাসরি উদ্ধৃতিগুলো শোপেনহাওয়ারের Parerga and Paralipomena ("On Noise", "On Reading and Books", "Aphorisms on the Wisdom of Life") এবং The World as Will and Representation থেকে অনুদিত।

এই ইনসাইটটি কি আপনার ভালো লেগেছে?

আপনার মতামত জানান অথবা এই কৌশলগুলো আপনার ব্যবসায় কীভাবে প্রয়োগ করা যায় তা নিয়ে আলোচনার জন্য যোগাযোগ করুন।

যোগাযোগ করুন
Sadiq Alam

এআই সারসংক্ষেপ জানুন

তথ্য জানতে একটি এআই মডেল নির্বাচন করুন