
হালালকে কি আমরা ব্যবসা হিসেবে নিতে প্রস্তুত? 'থিংক হালাল, গ্রো গ্লোবাল' সেমিনারে যা শুনলাম
১৯ আগস্ট, ঢাকার Radisson Blu হোটেল। বাইরের তাপ যেন শহরের সব ক্লান্তি এক জায়গায় জড়ো করে রেখেছে। অথচ ভেতরের হলঘরে অন্য এক ছবি। মালয়েশিয়ান হাইকমিশন আয়োজিত সেমিনারের নামটা শুনেই আগ্রহ হয়েছিল: 'থিংক হালাল, গ্রো গ্লোবাল'। অর্থাৎ ভাবুন হালালের কথা, বাড়ান বৈশ্বিক পরিসরে। ঢুকেই দেখলাম, হলভর্তি মানুষ। সরকারি কর্মকর্তা, কূটনীতিক, বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের নেতারা, আর এমন সব উদ্যোক্তা, যারা হালালকে শুধু ধর্মীয় বিধান নয়, ব্যবসা হিসেবে দেখতে এসেছেন। হ্যান্ডশেক আর ব্যবসায়িক কার্ডের আদান-প্রদানে শুরু হয়ে গেছে আলোচনা।
বাইরে থেকে দেখলে এটা আরেকটি সেমিনার মনে হতে পারে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা বসে শোনার পর বোঝা গেল, এখানে একটা বড় অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে কথা হচ্ছে। আর এমন একটি সেমিনার যখন হাইকমিশন পর্যায় থেকে আয়োজন করা হয়, তখন এর পেছনে কূটনৈতিক তাৎপর্যও থাকে। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য হালাল শিল্প মানে শুধু রপ্তানি আয় নয়; নতুন কর্মসংস্থান, নতুন উদ্যোক্তা, ছোট ও মাঝারি ব্যবসার সম্প্রসারণ, এমনকি একটি বিশ্বাসযোগ্য দেশীয় ব্র্যান্ড তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও। হলজুড়ে যে মিশ্র ভিড়টা দেখলাম, তাতে প্রজন্মের ব্যবধানও চোখে পড়ল। Experienced ব্যবসায়ীরা কথা বলছিলেন নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে, যারা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আর বৈশ্বিক বাজারের ভাষায় স্বচ্ছন্দ।
প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তার প্রথম বক্তব্যটাই মনে গেঁথে গেছে। হালাল খাদ্য, হালাল সংস্কৃতি, হালাল মূল্যবোধ—এগুলো শুধু মুসলিম বিশ্বের নয়, সমগ্র মানবসভ্যতার সম্পদ ও শক্তি হয়ে উঠতে পারে। কথাটা ভাবলে অবাক হতে হয়। আমরা হালালকে এতদিন এক ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক বিষয় হিসেবে আলোচনা করেছি। মন্ত্রী সেই সীমা ছাড়িয়ে এটাকে তুলে দিলেন অনেক বড় ক্যানভাসে: বৈশ্বিক অর্থনীতি আর মানবকল্যাণ। তিনি বলেছেন, হালাল খাদ্যের বাজার বিশাল। বিশ্ববাজারে হালাল পণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। মানুষ আরও ভালো মানের হালাল পণ্যের অপেক্ষায়। বিনিয়োগকারীরাও এই খাতের সম্ভাবনা দেখে সুযোগ খুঁজছেন।
আরও একটা কথা আমার ভাবনায় থেকে গেছে। হালাল মানে তো শুধু কোনো নির্দিষ্ট রন্ধনপ্রণালী নয়। এর গভীরে আছে পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা, স্বচ্ছতা আর নৈতিক উৎপাদনের ধারণা—যে মূল্যবোধগুলো কোনো বিশেষ ধর্মের সীমানায় আটকে থাকে না। এ কারণেই মন্ত্রীর কথাটা এত গুরুত্বপূর্ণ: হালাল যদি সত্যিই এসব মূল্যবোধের প্রতীক হয়, তবে তার বাজার মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কেন? বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের ক্রেতা, যিনি খাদ্য নিরাপত্তা আর নৈতিক উৎপাদনকে গুরুত্ব দেন, তিনি এই বাজারের অংশ হতে পারেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিই হালালকে প্রান্তিক আগ্রহ থেকে বৈশ্বিক সুযোগে পরিণত করে।
সবচেয়ে বেশি যেটা ভাবিয়েছে, সেটা হলো মন্ত্রী যেখানে সমস্যাটা চিহ্নিত করেছেন। বাজারই সমস্যা নয়। চাহিদাই সমস্যা নয়। সমস্যা হলো, হালাল শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য দরকার সঠিক আইডিয়া, তথ্য, জ্ঞান আর একটি সঠিক ব্যবসায়িক কাঠামো। এগুলো যদি একসঙ্গে জোড়া লাগে, তাহলে বড় বাজার তৈরি হবে, ভোক্তাদের কাছে হালাল পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। তাই তিনি উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। সেখানে বসে আমার মনে হয়েছে, বাংলাদেশের যেকোনো উদীয়মান খাতের ক্ষেত্রেই এটা সত্যি। কাঁচা সুযোগটা সামনে থাকে; আমাদের ঘাটতি থাকে সংগঠনে, মানে, আর বিশ্বমানের ক্রেতার জন্য তৈরি হওয়ার আত্মবিশ্বাসে।
এই জ্ঞান-নির্মাণের কাজটা কীভাবে হবে, সেটাও ভাবতে হবে। প্রশিক্ষণ, গবেষণা, বাজার-তথ্য, মান নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান, রপ্তানি-বান্ধব নীতিমালা—এসবের সমন্বয় ছাড়া শুধু সম্ভাবনার কথা বলে লাভ নেই। কাঁচামাল থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাত পণ্য, প্যাকেজিং, পরিবহন—প্রতিটি স্তরে মান বজায় রাখতে হবে। হালাল পণ্য আসলে আস্থার পণ্য। যে দেশ সার্টিফিকেশন, মান নিয়ন্ত্রণ আর স্বচ্ছ সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই আস্থা জিততে পারবে, সে-ই এই বাজার ধরবে। আর এখানে প্রযুক্তি, ব্র্যান্ডিং আর ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসের মতো বিষয়গুলোও জড়িয়ে যায়। শুধু 'হালাল' লেখা লেবেল আটকানো নয়, পুরো প্রক্রিয়াটাকে স্বচ্ছভাবে বিশ্ববাজারের সামনে তুলে ধরাই হবে আসল কাজ।
সেমিনারের দ্বিতীয়ার্ধটা ছিল অংশীদারিত্বের গল্প। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক কুয়ালালামপুর সফরের কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী যে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন, কর্তৃপক্ষ যে চমৎকার সব ব্যবস্থা করেছে, সেটাকে তিনি দুই দেশের বন্ধুত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বলেছেন। সম্পর্কের গভীরতা শুধু রাষ্ট্রীয় যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; জনগণের মূল্যবোধ ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে তা আরও উন্নত হতে পারে। ধর্ম ও সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আর মালয়েশিয়ার যে মিল, সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে হালাল শিল্পের বিকাশ আর বৈশ্বিক বাজার সম্প্রসারণে দু'দেশ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। হালাল শিল্প হয়ে উঠতে পারে দুই দেশের সম্পর্কের এক নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র।
মালয়েশিয়া তো হালাল শিল্পে বিশ্বের অন্যতম এগিয়ে থাকা দেশ। দেশটির সেই অভিজ্ঞতা আর বাংলাদেশের উৎপাদন ক্ষমতা একসূত্রে গাঁথা হলে দু'পক্ষেরই লাভ। যৌথ সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, এমনকি যৌথ ব্র্যান্ডিং পর্যন্ত হতে পারে সহযোগিতার পরিসর। কাগজে-কলমে কথাগুলো সহজ শোনালেও বাস্তবে এর জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আর দু'দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিয়মিত সংলাপ। সেমিনারটা যেটা করল, সেটা হলো সেই সংলাপের প্রথম ধাপটা চালু করা।
মঞ্চে ছিলেন মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার মোহদ শুহাদা ওথমান এবং বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার শহীদ। সঙ্গে ছিলেন ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিরা। তাদের উপস্থিতি যেকোনো বক্তৃতার চেয়ে বেশি কথা বলে: এ আর কোনো প্রান্তিক আলোচনা নয়। এক দেশের রাষ্ট্রদূত আর দুই দেশের ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা যখন এক মঞ্চে হালাল নিয়ে কথা বলেন, তখন বোঝা যায়, বিষয়টা নীতি-নির্ধারণী পর্যায়েও গুরুত্ব পাচ্ছে।
সেমিনার থেকে বের হওয়ার পথে আরও একটা কথা মনে হচ্ছিল। এসব আলোচনা শুধু বড় করপোরেটের জন্য নয়। দেশের ছোট খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, মসলা উৎপাদক, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ, এমনকি অনলাইনে ব্যবসা করা তরুণ উদ্যোক্তারাও এই বাজারের অংশ হতে পারেন, যদি তারা মান আর মানক নিয়ে কাজ করেন। গ্লোবাল মার্কেটে ঢোকার দরজা এখন আগের চেয়ে অনেক খোলা। কিন্তু দরজা খোলা মানেই ঢুকে পড়া নয়; ভেতরে টিকে থাকতে হয় নির্ভরযোগ্যতায়। সেই নির্ভরযোগ্যতা অর্জনের দায়িত্বটা কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীদেরই।
Radisson Blu থেকে বের হওয়ার সময় একটা চিন্তা নিয়ে বেরিয়েছি। হালাল এখন ধর্ম, বাণিজ্য আর কূটনীতির মিলনবিন্দুতে দাঁড়িয়ে। বাংলাদেশকে বলা হচ্ছে, এটাকে অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে। আমার কাছে এটা শুধু এক সেমিনারের সারসংক্ষেপ নয়; বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি সম্ভাব্য নতুন অধ্যায়ের শুরু। মন্ত্রী দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। চাহিদা আছে, বিনিয়োগকারী খুঁজছেন, জানালাটা খোলা। প্রযুক্তির এই যুগে বাজার তো আর ভৌগোলিক সীমানায় আটকে নেই; ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এক ক্লিকেই পৌঁছে যাওয়া যায় বিশ্বের যেকোনো ক্রেতার কাছে। প্রশ্নটা এখন আমাদের উদ্যোক্তাদের কাছে: বিশ্ববাজারের প্রত্যাশিত মান, মানক আর আস্থা নিয়ে তারা কি এগিয়ে আসবেন? আরও সোজা করে বললে—আমরা কি এই বাজারটা ধরতে পারব, নাকি আবারও শুধু দর্শক হয়ে থাকব?
সেমিনার ফটো গ্যালারি














অনুরূপ ইভেন্টে আগ্রহী?
সাদিক মোহাম্মদ আলমকে আপনার পরবর্তী ইভেন্টে আমন্ত্রণ জানাতে বা সম্ভাব্য সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনার জন্য যোগাযোগ করুন।
যোগাযোগ করুন