
সোলো কনসালটিংয়ের মঞ্চ: Solo Consultants Summit থেকে ফিরে
বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো iDEAN Consulting-এর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হলো Solo Consultants Summit। আর আমি ছিলাম সেখানে প্যানেলিস্ট। ব্যাংকিং, পাদুকা শিল্প, আইটি, হসপিটালিটি, মানবসম্পদ—দেশের নানা ইন্ডাস্ট্রির অভিজ্ঞ পেশাদারেরা এসেছিলেন এক মঞ্চে, নিজেদের ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে। হলভর্তি মানুষ, প্রত্যেকে নিজের ক্ষেত্রে কোনো না কোনো প্রতিষ্ঠান গড়েছেন বা গড়ার পথে আছেন। সেদিন সবার সামনে ছিল একটাই প্রশ্ন—দশ-পনেরো বছরের পুঁজি করা অভিজ্ঞতা কি কেবল একটা চাকরির দায়িত্বের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
প্রায় পাঁচ ঘণ্টার আয়োজন। ট্রেনিং, গেস্ট স্পিচ, প্যানেল ডিসকাশন, নেটওয়ার্কিং—প্রতিটি সেশনে ছিল প্রশ্ন, বিতর্ক আর অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান। iDEAN Consulting-এর প্রতিষ্ঠাতা ও এক্সিকিউটিভ কনসালট্যান্ট Mark Anupom Mollick-এর ট্রেনিং সেশন ছিল দিনের শুরু। সলো কনসালটিং প্র্যাকটিসের কৌশল, বাংলাদেশের সম্ভাবনা, আর যাঁরা আগে এই পথে হেঁটেছেন তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতা—ট্রেনিংয়ের টেবিল ঘিরে এসব নিয়েই ছিল সবচেয়ে সরস আলোচনা। টেবিলের এক পাশে কেউ নোট করছিলেন, আরেক পাশে কেউ নিজের ক্ষেত্রের উদাহরণ দিয়ে প্রশ্ন করছিলেন। যাঁরা সলো কনসালটিংকে এখনো ঝুঁকিপূর্ণ একটা লাফ বলে ভাবেন, তাঁদের জন্য এটাই ছিল প্রথম ধাপটা।
게স্ট স্পিকার হিসেবে ছিলেন Innovision Consulting-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর Md. Rubaiyat Sarwar এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর Brig. Gen. Md Khalil Ur Rahman (NDC, PSC, TE (LPR))। একজন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান গড়ার পথ থেকে কথা বলেছেন, আরেকজন দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা থেকে। দুইজনেই নিজেদের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে সলো কনসালটিংয়ের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেছেন। কর্পোরেট আর পাবলিক সার্ভিস—এত ভিন্ন দুই জগতের মানুষ যখন একই বিষয়ে একমত, তখন বোঝা যায়, বিষয়টা কোনো ক্ষণিকের ট্রেন্ড নয়। দুটি বক্তৃতাই মনে করিয়ে দিল, কনসালটিং মানে শুধু পরামর্শ দেওয়া নয়; এটা আস্থার ব্যবসা। রাষ্ট্রীয় খাত হোক বা কর্পোরেট খাত—সব জায়গাতেই এখন এমন পেশাদারের চাহিদা, যিনি নিজের অভিজ্ঞতাকে পরামর্শে রূপ দিতে পারেন। গেস্ট স্পিকারেরা ছিলেন সেই চাহিদারই প্রতিনিধিত্ব।
সামিট ভিডিও হাইলাইটস
আমার জন্য দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তটা ছিল দ্বিতীয় প্যানেল—"Building a Successful Solo Consulting Practice: The Skill Set"। মডারেটর ছিলেন Clustag-এর সিনিয়র সেলস কনসালট্যান্ট (South Asia) A B M Mizanur Rahman। প্যানেলিস্ট হিসেবে আমার পাশে বসেছিলেন Ai Cyber Security Team 360°-এর সিইও ও প্রতিষ্ঠাতা DIG Md Mahbubur Rahman Bhuiyan BPM Bar, Reverie Resort and Tourism Company Ltd-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর Mohammad Khan Monzur Wahid Uddin, PROFIRM-এর সিইও ও লিড কনসালট্যান্ট Md Mesbaul Hussain এবং Mercantile Bank PLC-এর শরিয়াহ অডিটর Md. Tarek Hussain Prodhan (PGDHRM, ICMC, CSAA, CFRM, AIBB)।
আমি Metamorphosis Ltd.-এর কো-ফাউন্ডার ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর। ব্যবসা চালাতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কনসালটিং আর একক কনসালট্যান্টের জীবন—এই দুই পৃথিবীর পার্থক্য আমি কাছ থেকে দেখেছি। প্যানেলে আমার মূল বক্তব্য ছিল, সলো কনসালট্যান্ট মানে একা কাজ করা নয়; মানে পুরো একটি প্রতিষ্ঠানের মতো নিজেকে সাজিয়ে নেওয়া, কিন্তু দলের বদলে দায়িত্বটা একজনের কাঁধে।
এই পথে টিকে থাকতে হলে প্রথম দরকার নিজের ডোমেইনে সত্যিকারের দক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা। ক্লায়েন্ট তো প্রশ্নই করবে, কেন আপনার পরামর্শ শুনব? যে ক্লায়েন্টের সামনে আপনার বছরের পর বছরের কাজের প্রমাণ নেই, তার কাছে আপনি হবেন আরেকজন উপদেষ্টা মাত্র। দ্বিতীয়ত, ক্লায়েন্ট খোঁজার এবং সম্পর্ক ধরে রাখার ক্ষমতা। আমি যাঁদের দেখেছি, এই ক্ষেত্রে সলো কনসালট্যান্টদের বেশির ভাগই ব্যর্থ হন দক্ষতার অভাবে নয়, ক্লায়েন্টের অভাবে। দক্ষ মানুষ অনেক আছেন, কিন্তু কে আপনার কথা জানবে, সে প্রশ্নটাই আসল। নেটওয়ার্কিংয়ের টেবিলে যে পরিচয়টা আজ গড়া হয়, সেটাই একদিন প্রথম প্রজেক্টের জন্ম দেয়। তৃতীয়ত, নিজেকে চালানোর শৃঙ্খলা—হিসাব, সময়, আর প্রতিনিয়ত শেখা। একটা প্রতিষ্ঠানে ব্যাকঅফিসের কাজগুলো করেন অনেকে; সলো কনসালট্যান্টকে নিজেই নিজের ব্যাকঅফিস হতে হয়। আর এখন যোগ হয়েছে quarto স্তর: ডিজিটাল ও এআই দক্ষতা। যে একক কনসালট্যান্ট এআই টুলসকে কাজে লাগাতে পারেন, তিনি আজ এমন কাজ ডেলিভার করতে পারেন, যা একসময় পুরো একটা টিমের দরকার হতো। এআই এখন প্রতিযোগিতার সুবিধা নয়, বেঁচে থাকার শর্ত।
আলোচনার শেষে দর্শকদের কাছ থেকে যে প্রশ্নগুলো এল, সেগুলো ছিল মাটির কাছাকাছি। প্রথম ক্লায়েন্ট কীভাবে পাব? রেট কীভাবে ঠিক করব? চাকরি ছেড়ে এই পথে আসা কি নিরাপদ? প্রশ্নগুলোই প্রমাণ করে, আগ্রহের অভাব নেই; দরকার শুধু সঠিক রোডম্যাপ আর সাহস। একজন দর্শক জানতে চাইলেন, প্রতিষ্ঠানের চাকরি আর সলো প্র্যাকটিস—দুটোই যদি সামলাতে চাই, কোথা থেকে শুরু করব? তখন প্যানেলের সবার কাছ থেকে একই সুরে এল উত্তর: শুরুটা ছোট করেই হওয়া উচিত। সপ্তাহান্তে একটি প্রকল্প, একজন ক্লায়েন্টের একটি সমস্যা সমাধান—এভাবেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় নিজের নাম। another প্রশ্ন করলেন, এই বাজারে রেট কমিয়ে দেওয়ার লোভ কীভাবে সামলাবেন? আমার উত্তর ছিল একটাই—দাম নিয়ে কথা বলবেন না, মূল্য নিয়ে কথা বলুন।
প্রথম প্যানেলের বিষয় ছিল "Scope for Solo Consultants: Bangladesh's Next Growth Engine"। মডারেটর ছিলেন Hat Bakso-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও Shafat Kadir। প্যানেলে ছিলেন Quick Growth-এর প্রতিষ্ঠাতা ও রকমারির সাবেক সিএমও Mehedi Hasan Rana, Apex Footwear Ltd.-এর ডেপুটি ম্যানেজার ও Future Icon-এর কনসালট্যান্ট Basir Ahmed, MSC-এর সিনিয়র ম্যানেজার (HR ও অ্যাডমিন) Israt Jahan Rimi, ওয়ান ব্যাংকের সাবেক সিনিয়র ম্যানেজার ও বর্তমানে More Than Financials Pty Ltd.-এর ইনডিপেনডেন্ট কনট্রাক্টর Shovon Kumer Deb এবং এআই ট্রান্সফরমেশন কোচ ও কনসালট্যান্ট Mahmudul Hasan। রকমারির মতো ই-কমার্স জায়ান্টের সাবেক সিএমও-র কাছ থেকে ই-কমার্সের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা শোনা মানে এক অন্য অভিজ্ঞতা। Apex Footwear-এর মতো প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে উঠে এল পাদুকা শিল্পের চ্যালেঞ্জের গল্প। দীর্ঘ ব্যাংকিং ক্যারিয়ার ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের হয়ে স্বাধীন কনট্রাক্টর হিসেবে কাজ করা Shovon Kumer Deb-এর যাত্রা ছিল সলো কনসালটিংয়ের এক জীবন্ত উদাহরণ। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার চোখে ক্যারিয়ার গড়ার পথ দেখালেন Israt Jahan Rimi, আর Mahmudul Hasan দেখালেন এআই ট্রান্সফরমেশনকে কীভাবে কনসালটিংয়ে রূপ দেওয়া যায়। যাঁরা ভাবেন, এই পথ শুধু আইটি বা বিজনেস কনসালট্যান্টদের জন্য, এই প্যানেল তাঁদের সেই ধারণা বদলে দিয়েছে।
সামিট শেষে নেটওয়ার্কিং সেশনে কফির কাপ হাতে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, ছোট ছোট দলে মানুষ আলোচনা করছেন—কে কোন ক্ষেত্রে কী করতে পারেন, কার সঙ্গে কার কাজের মিল। এমন আলোচনা থেকেই জন্ম নেয় যৌথ প্রকল্প, জন্ম নেয় নতুন ক্লায়েন্ট। মনে হচ্ছিল, এটাই তো শুরু। এই মানুষগুলো একে অপরের ব্যবসায়িক কার্ড আর অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে—ঠিক এভাবেই তৈরি হয় একটি মুভমেন্ট। বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী কনসালটিং মুভমেন্ট গড়ে তোলার যাত্রা শুরু হয়ে গেছে। সলো কনসালটিং শুধু একটি ক্যারিয়ার অপশন নয়; জ্ঞান, অভিজ্ঞতা আর ইমপ্যাক্ট তৈরির একটি নতুন দিগন্ত।
ফটো গ্যালারি























































































iDEAN Consulting এবং Mark Anupom Mollick-কে ধন্যবাদ, এমন একটি মঞ্চ গড়ে তোলার জন্য। আর যাঁরা এখনো ভাবছেন, আমার বছরের পর বছরের অভিজ্ঞতা কি শুধু অফিসের ফাইল ক্যাবিনেটে পড়ে থাকবে, নাকি অনেক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত বদলে দেওয়ার হাতিয়ার হবে—মঞ্চ তৈরি হয়ে গেছে। এবার পা বাড়ানো আপনার হাতে।
অনুরূপ ইভেন্টে আগ্রহী?
সাদিক মোহাম্মদ আলমকে আপনার পরবর্তী ইভেন্টে আমন্ত্রণ জানাতে বা সম্ভাব্য সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনার জন্য যোগাযোগ করুন।
যোগাযোগ করুন