
রেমিট্যান্সের আড়ালে যে হিসাবটা আমরা রাখি না - জনভাষ্য পডকাস্ট
রেমিট্যান্সের আড়ালে যে হিসাবটা আমরা রাখি না - জনভাষ্য পডকাস্ট
আজকে জনভাষ্য পডকাস্টের প্রথম পর্বটা রেকর্ডিং শেষ করলাম। এই পর্ব প্রবাসী শ্রমিকদের অর্থনৈতিক অবদানের গল্প নয়। এটা সেই অবদানের দামটা আসলে কে দিচ্ছে, আর কে দিচ্ছে না — সেই হিসাবটা চাওয়ার গল্প। পডকাস্টে আমি হোস্ট ছিলাম।
পডকাস্টের অতিথি ছিলেন অর্থনীতিবিদ ও গবেষক মাহতাব উদ্দিন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং বা SANEM-এর অনারারি রিসার্চ ডিরেক্টর।
গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বাংলাদেশের শ্রমবাজার, কর্মসংস্থান, আন্তর্জাতিক শ্রম অভিবাসন, রেমিট্যান্স এবং দারিদ্র্য ও বৈষম্য নিয়ে গবেষণা করছেন। এ সময়ে তিনি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO), International Development Research Centre (IDRC), আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM), জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP), যুক্তরাজ্যের FCDO-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীর শ্রম বাজার এবং প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে গবেষণা প্রকল্পে কাজ করেছেন। বিশেষ করে অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও সুরক্ষা, নিয়োগপ্রক্রিয়া, শ্রমবাজারের কাঠামো এবং কর্মসংস্থানের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে তাঁর গবেষণার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এই বিষয়ে তাঁর একাধিক জার্নাল ও বুক চ্যাপ্টার পাবলিকেশন আছে।
তিনি যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে কমনওয়েলথ স্কলার হিসেবে পিএইচডি গবেষণা করেছেন। তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভের মূল বিষয় আন্তর্জাতিক অভিবাসন ও রেমিট্যান্সের প্রভাব—বিশেষ করে বাংলাদেশের গ্রামীণ পরিবারের দারিদ্র্য, বৈষম্য ও অর্থনৈতিক কল্যাণের ওপর এর প্রভাব এবং কোভিড-১৯ মহামারির মতো বড় অর্থনৈতিক সংকটের সময় অভিবাসী পরিবারগুলো কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে।
তাঁর সঙ্গে কথা বলেছি বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের অর্থনৈতিক অবদান, তাঁদের জীবনের ঝুঁকি, শোষণ ও নিরাপত্তাহীনতা এবং তাঁদের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে।
নজরুল ইসলাম এবং সুইটি আক্তার সম্প্রতি সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডের শিকার হয়েছে। আমরা মনে করি তাদের প্রতি কেবল সৌদি সরকার অন্যায় করে নাই, আমাদের রাষ্ট্র তাদের খোঁজ নিতে, সমস্যা শুনতে ও সুরাহা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
তাই প্রবাসীদের প্রতি আমাদের রাষ্ট্রের দায় মনে করিয়ে দিয়ে আমরা আলাপ করেছি বিদেশে শ্রমিক সুরক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিয়ে গন্তব্য দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও কার্যকর আলোচনা, নারী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা - এরকম অনেকগুলো বিষয় নিয়ে।
প্রায়ই ’রেমিটেন্স যোদ্ধা’ খেতাব দিয়ে প্রবাসী শ্রমিকদের আমরা টাকার মেশিন বা এটিএম মনে করি। কত টাকা গত মাসে রেমিটেন্স আসলো সেটা নিয়েই আমাদের যাবতীয় আলোচনা।
আমাদের অভিবাসননীতির সফলতা শুধু কতজন বিদেশে গেলেন এবং কত রেমিট্যান্স এল, তা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত নয়।

কতজন নিরাপদে কাজ করছেন, কতজনের অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে, কতদ্রুত একজন মজলুম প্রবাসীর সমস্যা বাংলাদেশের এম্বাসী / কনসুলেট সুরাহা করে দিতে পারলো, কতজন ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন, কতজন ঋণমুক্ত হয়ে ফিরেছেন, এসবও সরকারের সাফল্যের সূচক হতে হবে।
আমি মাহতাব উদ্দিনকে প্রথম প্রশ্নটাই করেছিলাম সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে। তিনি উত্তরটা দুই ভাগে ভাগ করলেন, আর সেটাই পর্বের কাঠামো ঠিক করে দিল। প্রথমত, ওই দুই জনের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল, বিচারে তাঁরা আইনি সহায়তা পেয়েছিলেন কি না — এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের কাছে নেই।
দ্বিতীয়ত, আর এটাই তাঁর মতে বড় প্রশ্ন — বিদেশে থাকা নাগরিকের সুরক্ষায় আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটা আদৌ কাজ করছে কি না। তাঁর একটা বাক্য আমি বারবার ফিরে আসছি: কর্মী পাঠানোর জন্য যতটা প্রতিষ্ঠান গড়েছি, তাঁদের সুরক্ষার জন্য কি ততটা গড়েছি?
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী ১৯৭৬ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত এক কোটি ৬০ লাখের বেশি মানুষ বিদেশে গেছেন, শুধু ২০২৫-এই ১১ লাখ ৩১ হাজার। ওই বছর রেমিট্যান্স এসেছে ৩২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু টাকার অঙ্কটাই সব নয়। যে পরিবার ঋণ নিয়ে সন্তানকে সৌদি পাঠিয়েছে, আর যে পরিবার পাড়ার দালালের কথায় গেছে — দুটো পরিবারের জন্য একই ৩২ বিলিয়ন ডলারের অর্থ দুই রকম।
আরেকটি অংশ যা আমার প্রত্যাশার বাইরে গিয়েছিল — অভিবাসনের অসম সুফল। গবেষণার পর্যবেক্ষণটি সরল, কিন্তু অস্বস্তিকর: আন্তর্জাতিক অভিবাসন দারিদ্র্য কমায়, তবু সব পরিবারের কাছে সেই সুফল সমানভাবে পৌঁছায় না। যে পরিবার চার-পাঁচ লাখ টাকা জোগাড় করতে পারে, সে-ই বিদেশে যেতে পারে; সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলো প্রাথমিক খরচটাই বহন করতে পারে না। ফলে দারিদ্র্য কমে, বৈষম্য বাড়ে। বক্তার এই কথাটি পর্বের কেন্দ্রে থাকা উচিত ছিল, এসেছে মাঝপথে।
নারী শ্রমিকদের অংশটাও আলাদা করে শোনার মতো। বিএমইটির তথ্যে ২০০৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিদেশগামী বাংলাদেশি নারী কর্মীর প্রায় ৪৭ শতাংশ গেছেন সৌদি আরবে, অনেকেই গৃহকর্মী হিসেবে। তাঁদের কর্মক্ষেত্র ব্যক্তিগত বাড়ি, ফলে সাধারণ শ্রম পরিদর্শনব্যবস্থার পৌঁছানো কঠিন। আর সবচেয়ে কঠিন সত্যটা গবেষক বলেছেন এভাবে — নির্যাতনের শিকার অনেক নারীর হাতে ফোনই থাকে না, পাসপোর্ট আটকে রাখা হয়। অর্থাৎ হেল্পলাইনে ফোন করার অবস্থাটাই অনেকের নেই। এই একটি বাক্য পুরো সুরক্ষা-ব্যবস্থার সীমা দেখিয়ে দেয়।
পর্বের সবচেয়ে শক্ত জায়গা, আমার মতে, তিনটি। এক, গবেষক যেখানে সংখ্যাকে সংখ্যা হিসেবেই রাখলেন। ফ্রন্টেক্সের ১৩ হাজার ৪১৭ থেকে ২২ হাজার ৩৫৩ — এটি শনাক্তকরণ, অনন্য ব্যক্তি নন; নিহতের হিসাবে ৮৩ হাজারও বৈশ্বিক সংখ্যা, বাংলাদেশিদের নয়। এই সংযমটা সহজ নয়, কারণ টেলিভিশন আলোচনায় ঠিক এই জায়গাতেই সংখ্যা ফুলে ওঠে।
দুই, বিমানভাড়ার তুলনা — ঢাকা থেকে রিয়াদ ৪৯ হাজার ৪০০ টাকা, করাচি থেকে ২৪ হাজার ৭০০। একটি যাচাইযোগ্য অঙ্ক কাঠামোগত অন্যায়কে ভাষা দেয়, আর শ্রোতা এই একটা সংখ্যা মনে রাখেন। তিন, ঋণের ব্যাখ্যা। যে শ্রমিক ঋণ নিয়ে গেছেন, বেতন আটকে গেলেও তাঁর পালানোর সুযোগ নেই — প্রথম এক-দুই বছর তাঁর আয়ের উদ্দেশ্যই ঋণ শোধ। নির্যাতন সহ্য করার কারণটা এখানেই স্পষ্ট হয়।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার হিসাবে প্রায় ৪৫ শতাংশ শ্রমিক তথ্য ও সহায়তার জন্য দালাল বা উপ-এজেন্টের ওপর নির্ভর করেন, কিন্তু গবেষক নিজেই যোগ করলেন, সব মধ্যস্থতাকারী প্রতারক নন। এই বাক্যটা না থাকলে পর্বটা সহজ প্রবন্ধ হয়ে যেত।
কাদের জন্য এই পর্ব? শ্রম অভিবাসন নিয়ে কাজ করা সাংবাদিক, এনজিও ও অধিকারকর্মী, নীতিনির্ধারক, এবং সবচেয়ে বেশি — বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এমন কেউ ও তাঁর পরিবার। যাঁরা এই বিষয়ে দ্রুত সমাধান বা সাফল্যের গল্প খুঁজছেন, তাঁরা বাদ দিতে পারেন। এখানে সান্ত্বনা নেই, আছে প্রশ্ন। আছে রাষ্ট্রকে জবাবদিহি করার প্রশ্ন।
অনুরূপ ইভেন্টে আগ্রহী?
সাদিক মোহাম্মদ আলমকে আপনার পরবর্তী ইভেন্টে আমন্ত্রণ জানাতে বা সম্ভাব্য সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনার জন্য যোগাযোগ করুন।
যোগাযোগ করুন