
বাংলাদেশের প্রথম এআই সামিটে স্পিকার হিসেবে: ভাবনা থেকে কাজে নামার দিন
গত শুক্রবার (২১ আগস্ট) ঢাকায় যে মঞ্চে দাঁড়িয়ে ছিলাম, সেটি বাংলাদেশের প্রথম নিবেদিত এআই সামিটের মঞ্চ। 'প্রথম' শব্দটা উচ্চারণ করতে গেলে বুকের ভেতরটা অন্য রকম হয়ে যায়। কারণ আমরা অভ্যস্ত, এই দেশে নতুন কোনো প্রযুক্তি নিয়ে প্রথম আয়োজন হলে সেটা হয় সাধারণত বিদেশি অনুষ্ঠানের অনুলিপি। কিন্তু এবারের ছবিটা ভিন্ন ছিল। এআই নিয়ে কথা বলার জন্য দেশের এইচআর পেশাজীবী, ব্যবসায়িক নেতা, প্রযুক্তিবিদ, নীতিনির্ধাকর, শিক্ষাবিদ—সবাই এক ছাদের নিচে এসেছিলেন, আর সেটাও সত্যিকারের কাজের ভাষায়। দরজা দিয়ে ঢোকার সময়ই বোঝা যাচ্ছিল, এটা কোনো সাধারণ সেমিনার নয়। কেউ ল্যাপটপে নোট নিচ্ছেন, কেউ ব্যবসায়িক কার্ড বদলাচ্ছেন, কেউ আগে থেকেই পরিচিত—সবাই যে একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এসেছেন, সেটা বোঝা যাচ্ছিল চোখে চোখে।
আয়োজনটি ছিল হাউস অব লার্নিং অ্যান্ড ডোনেটিং (হোল্ড)-এর। শিক্ষার প্রসার আর সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কল্যাণে কাজ করা এই সামাজিক সংগঠনটি ২০১৩ সাল থেকে এইচআর, প্রশাসন, ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসহ নানা খাতের পেশাজীবীদের জ্ঞান বিনিময়ের প্ল্যাটফর্ম হয়ে আসছে। এবার তারা আয়োজন করেছিল 'মাই উইন্ডো প্রেজেন্টস হোল্ড এআই সামিট ২০২৬, পাওয়ার্ড বাই এআইফোরবিটি'। মিডিয়া পার্টনার হিসেবে ছিল চ্যানেল টোয়েন্টিফোর ও সমকাল। একটি বিকেলজুড়ে আলোচনা হলো দেশের জন্য এআই যে সুযোগ আর দায়িত্ব বয়ে আনে, তা নিয়ে।

অনুষ্ঠানের শুরুটা হয়েছিল হোল্ডের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ নূর ই আলমের স্বাগত বক্তব্য দিয়ে। তিনি একজন মানবসম্পদ পেশাজীবী, দীর্ঘদিন ধরে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের শিক্ষানির্ভর উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর কথায় বারবার ফিরে এসেছে একটি বিষয়—এআইকে যদি দায়িত্বশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে নেওয়া যায়, তাহলে সেটি জাতীয় অগ্রগতির শক্তিশালী অনুঘটক হয়ে উঠতে পারে। প্রতিষ্ঠান হোক বা ব্যক্তি, সবার জন্যই নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। সেদিন সবার কণ্ঠে যে সুরটা বাজছিল, সেটাই ছিল এটা।






















আমার অংশ ছিল 'এআই লিডারশিপ: ফ্রম অ্যাওয়ারনেস টু অ্যাকশন' শীর্ষক সেশনটি। সহ-উপস্থাপক ছিলেন এআইফোরবিটি গ্লোবালের সিইও মো. মাহমুদুল হাসান। আমরা দুজন মিলে যে কথাটা বলার চেষ্টা করেছি, সেটা আমার পরামর্শক জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা। দিনের পর দিন আমি দেখছি, বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান এআই নিয়ে আলোচনা করছে, ওয়েবিনার করছে, আর্টিকেল পড়ছে—কিন্তু কাজের পর্যায়ে যাচ্ছে না। কেউ কিনে ফেলছেন দামি এআই টুল, অথচ সেই টুল ব্যবহারের কোনো প্রক্রিয়া নেই। কেউ আবার বার্ষিক প্রতিবেদনে লিখছেন 'এআই প্রযুক্তি গ্রহণ করা হয়েছে', কিন্তু কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। ডেটা ছড়িয়ে আছে এক্সেল ফাইলে, কোনো কাঠামো নেই। টুল কেনা সহজ, বদলানো কঠিন—এই সত্যটা অনেকেই এড়িয়ে যান। 'আওয়ারনেস' থেকে 'অ্যাকশন'-এর এই ফাঁকটাই সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা।
আমাদের সেশনে আমরা সেই ফাঁক পেরোনোর পথ নিয়ে কথা বলেছি। কোথা থেকে শুরু করতে হবে, কোন প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি মূল্য তৈরি হবে, কীভাবে ছোট ছোট পাইলট প্রজেক্ট দিয়ে সেটা মাপা যায়, ডেটার ভিত্তি কেমন হওয়া দরকার, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—মানুষকে বদলাতে হবে। কারণ প্রযুক্তি একা কখনো প্রতিষ্ঠান বদলায় না; বদলায় মানুষ, যে সেই প্রযুক্তিকে কাজে লাগায়। চেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট ছাড়া এআই প্রজেক্ট মানে টাকার অপচয়, এই কথাটা আমরা পরিষ্কার বলেছি। হলঘরের যে প্রতিক্রিয়া পেয়েছি, তাতে মনে হয়েছে বার্তাটা ঠিকঠাক পৌঁছেছে। নেতারা আর জিজ্ঞেস করছেন না 'এআই কী জিনিস', তারা জিজ্ঞেস করছেন 'কোথা থেকে শুরু করব'।
সেশন শেষে প্রশ্নের ঝড় উঠেছিল। কেউ জানতে চাইলেন, ছোট প্রতিষ্ঠান সীমিত বাজেটে এআই শুরু করবে কীভাবে। কেউ জিজ্ঞেস করলেন, কর্মীদের ভয় দূর করবেন কী করে। কারও প্রশ্ন ছিল ডেটা নিয়ে—আমাদের তথ্য কি নিরাপদ থাকবে? এই প্রশ্নগুলোই প্রমাণ, মানুষ শুধু শুনতে আসেননি; তাঁরা বাড়ি ফিরে কী করবেন, সেই পথই খুঁজছিলেন।
আরও দুটি সেশন ছিল উল্লেখযোগ্য। ফকির ফ্যাশন লিমিটেডের হেড অব ওডি অ্যান্ড ট্যালেন্ট ম্যানেজমেন্ট ইমতিয়াজ মোস্তফা কথা বলেছেন 'এআই ফর এইচআর প্রফেশনালস' নিয়ে—মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় এআই কীভাবে ঢুকছে, কর্মক্ষেত্র কেমন বদলাচ্ছে। আর ডিআইজি (পিআরএল) মো. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া উপস্থাপন করেছেন 'এআই সাইবার সিকিউরিটি সলিউশনস'। তাঁর কথাটা ছিল সময়োপযোগী সতর্কবার্তা—প্রতিটি নতুন ক্ষমতার সঙ্গে নতুন দায়িত্ব আসে। এআই যত শক্তিশালী হচ্ছে, সাইবার নিরাপত্তা তত জরুরি হয়ে উঠছে।
দিনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ছিল 'দ্য ফিউচার অব এআই' প্যানেল আলোচনা। রবির সিনিয়র জিএম রেদওয়ানুল হক রাজুর সঞ্চালনায় প্যানেলে ছিলেন প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শাদরুল আলম, গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) মো. আবুল হোসেন, সাবেক সচিব এএসএম মাহবুবুল আলম, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম রফিকুল ইসলাম এবং বিডি ফাইন্যান্স পিএলসির গ্রুপ সিটিও মো. ফয়সাল হোসেন। স্বাস্থ্যসেবায় রোগ নির্ণয় থেকে প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, সরকারি সেবায় জট কমিয়ে নাগরিকের সময় বাঁচানো, জ্বালানি খাতে চাহিদার পূর্বাভাস, ব্যাংকিংয়ে ঝুঁকি বিশ্লেষণ—একেকজন নিজের খাত থেকে একেকটা উদাহরণ দিয়েছেন। পাঁচ থেকে দশ বছরের যে ছবিটা তাঁরা এঁকেছেন, তার কেন্দ্রে ছিল একই সূত্র: দায়িত্বশীল গ্রহণ, মানব সক্ষমতা, শাসনব্যবস্থা আর সঠিক ইকোসিস্টেম। ঘোষণা আর বাস্তবায়নের ফারাক আমরা হাতে-কলমে চিনি; এই প্যানেল সেদিন সেই ফারাক কমাতেই জোর দিয়েছে।
একটা কথা সেদিন আমাকে সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে গেছে। ডেকো ইশো ভেঞ্চার ক্যাপিটালের হেড অব কমিউনিকেশনস তারিফ মোহাম্মদ খান বলেছিলেন, 'এআই আমাদের প্রতিযোগী হবে না; rather, আমাদের কাজের অংশীদার হয়ে উঠবে।' এই একটি বাক্য যেন পুরো অনুষ্ঠানের সারমর্ম। ভয়ের গল্প না বলে, চাকরি হারানোর ভয় না দেখিয়ে, এআইকে কাজের সহকর্মী হিসেবে দেখার এই মানসিকতাই বাংলাদেশের দরকার।
রাতের নেটওয়ার্কিং ডিনারে সেই কথাবার্তা আরও এগিয়ে গেছে। পরিচিত মুখগুলোকে নতুনভাবে চেনা হয়েছে, নতুন সহযোগিতার সূত্রপাত হয়েছে, 'এআই-প্রস্তুত বাংলাদেশ' গড়ার স্বপ্নটা আরও বাস্তব রূপ নিয়েছে। এই ধরনের আয়োজনের সবচেয়ে বড় মূল্য হলো, মানুষ একে অপরের কাছ থেকে শেখে। একজন ব্যাংকার জানতে পারেন, তার খাতের অন্যরা এআই দিয়ে কী করছেন; একজন শিক্ষাবিদ বুঝতে পারেন, শিল্পখাত আসলে কোন দক্ষতা চাইছে। সিলেবাস আর বাস্তবতার ফাঁকটা এমন আলোচনাতেই কমে।

আমার কাছে এই সামিট শুধু একটা অনুষ্ঠান ছিল না। প্রমাণ যে বাংলাদেশে এআই নিয়ে কথোপকথন পরিণত হচ্ছে—আওয়ারনেস থেকে অ্যাকশনের দিকে, ঠিক আমাদের সেশনের শিরোনামের মতোই। মঞ্চ থেকে নেমে ফেরার পথে একটা প্রশ্ন মনে ঘুরছিল: আগামী পাঁচ বছরে আমাদের কর্মক্ষেত্র, আমাদের সরকারি সেবা, আমাদের অর্থনীতি—কতটা বদলে যাবে, আর আমরা কি সেই বদলের চালক হব, নাকি শুধু যাত্রী? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সেমিনার হলে বসে মিলবে না; মিলবে অফিসে ফিরে, নিজের项目中 হাত দিয়ে, ভুল করে শিখে।
সেদিনের উত্তরটা আমি পেয়েছি বলেই বিশ্বাস করি। যে দেশে এইচআর পেশাজীবী, পুলিশের ডিআইজি, সাবেক সচিব, অধ্যাপক আর ব্যবসায়ী নেতারা এক মঞ্চে বসে এআই নিয়ে কাজের ভাষায় কথা বলতে পারেন, সেই দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। আর যারা সেদিন মঞ্চে ছিলেন না, তাদের জন্য আমার কথাটা হলো—শিক্ষার যাত্রাটা শুরু করুন আজই। শিখুন, ছোট করেই পরীক্ষা করুন। কারণ এআই অপেক্ষা করবে না; অপেক্ষা করলে পেছনে পড়ে যাবেন। শুরুটা হয়ে গেছে। এবার বাকিটা আমাদের হাতে।
অনুরূপ ইভেন্টে আগ্রহী?
সাদিক মোহাম্মদ আলমকে আপনার পরবর্তী ইভেন্টে আমন্ত্রণ জানাতে বা সম্ভাব্য সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনার জন্য যোগাযোগ করুন।
যোগাযোগ করুন